ইরানে টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও ব্যাপক এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতায় ৯ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ৮ জানুয়ারি রাতের বেলায় সারা দেশে হঠাৎ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সে সময় দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ তোলে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইন্টারনেটের কিছু ব্যান্ডউইথ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ফোনকল এবং খুদে বার্তা সেবা আংশিকভাবে ফিরলেও এখনো অধিকাংশ মানুষ অবাধভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে পারছেন না। কঠোর রাষ্ট্রীয় ফিল্টারিংয়ের কারণে যোগাযোগ কার্যত সীমিত রয়ে গেছে।
অনেকে বিকল্প উপায়ে সংযোগ পেতে প্রক্সি ও ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন, তবে সেগুলো ব্যয়বহুল এবং স্থায়ী সমাধান নয়। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইন্টারনেট বন্ধ থাকাকালে প্রতিদিন অন্তত ৫০ ট্রিলিয়ন রিয়াল ক্ষতি হয়েছে ইরানের অর্থনীতিতে। মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকার জানিয়েছে, ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত সুপ্রিম জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নিয়েছে, যা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নির্বাচনী প্রচারে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ শিথিলের প্রতিশ্রুতি দিলেও এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন। সরকার অনলাইন ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতি ইতোমধ্যে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
তেহরানের এক ট্রাভেল এজেন্ট জানান, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তাদের আয়ের বড় অংশ হারাতে হয়েছে এবং কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় টিকিট কেনা, হোটেল বুকিং বা পাসপোর্ট নবায়নের কাজও বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কেবল স্থানীয় ফ্লাইট ও হোটেল সেবায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
রাজধানীর একটি অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, ইন্টারনেট না থাকায় বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দূতাবাস থেকে তথ্য না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনার আবেদন সময়মতো জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে বহু কর্মীকে ছুটিতে পাঠাতে হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকাকালে রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে কাজ করেনি। সংযোগ ছিল ধীরগতির ও অনির্ভরযোগ্য। অনেক প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত হতে পারেনি, আর যারা পেরেছে তারাও গ্রাহক হারিয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, বৈশ্বিক ইন্টারনেট বাদ দিয়ে কেবল দেশীয় নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, অনলাইন ব্যবসাগুলো সর্বোচ্চ ২০ দিন এমন অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।
ইরানের বাণিজ্য মণ্ডলীর প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রকাশিত ক্ষতির পরিসংখ্যান কেবল দৃশ্যমান ক্ষতি তুলে ধরে। আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপেই ইন্টারনেট অপরিহার্য। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং অনেক বিদেশি ক্রেতা অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত দেশে অনলাইনে আয় করে টিকে থাকার চেষ্টা করা বহু মানুষ এখন চরম উদ্বেগে রয়েছেন। ছোট অনলাইন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, রাঁধুনি, কনটেন্ট নির্মাতা ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবীরা আবার সংযোগ ফিরে পাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে সহায়তা চাইছেন।
তেহরানের এক তরুণ ভিডিও সম্পাদক জানান, বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর পর তিনি প্রায় সর্বস্ব হারাতে বসেছিলেন। আগেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় ডাক বিভাগ জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ডাক সেবার পরিমাণ ৬০ শতাংশ কমে যায়, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে ক্ষুদ্র ও ঘরভিত্তিক ব্যবসায়ীদের।
জীবিকার পাশাপাশি মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে যোগাযোগ বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। অনেকের মতে, ইন্টারনেট ব্যবহারের স্তরভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস করে কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি নয়—তা নির্ধারণ করার কোনো অধিকার সরকারের নেই। সাধারণ মানুষের ভাষায়, তথ্য জানার, শেখার ও মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তারা মানতে প্রস্তুত নন।
















