সংশোধিত এডিপির ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত হলো নতুন প্রকল্প; নির্বাচিত সরকারের ওপর আর্থিক চাপের শঙ্কা
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এক বিশাল উন্নয়ন পরিকল্পনায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) ‘সবুজ পাতায়’ যুক্ত করা হয়েছে নতুন ৮৫৬টি প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৮৭২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৭ লাখ ৩৬ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এসব প্রকল্পে এখনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তবে ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অর্থ হলো—প্রকল্পগুলো অনুমোদনের জন্য নীতিগতভাবে প্রাথমিক সবুজ সংকেত পেয়ে গেল। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদায়ী সরকারের এই পদক্ষেপ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর এক ধরণের বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের আবাসন এবং সচিবালয় ও মন্ত্রীদের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের মতো হাই-প্রোফাইল প্রকল্পগুলো এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সবুজ পাতায় নাম থাকা মানেই প্রকল্প পাসের নিশ্চয়তা নয়, তবে এটি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রকল্পটিকে অনুমোদনের দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে দেয়।
প্রকল্পের সংখ্যা ও অর্থায়ন কাঠামো
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৮৫৬টি প্রকল্পের অর্থায়নের উৎসগুলো হলো:
- সরকারি তহবিল (GOB): ৬৬৮টি প্রকল্প।
- বৈদেশিক ঋণ: ১৫৬টি প্রকল্প।
- স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন: ৩২টি প্রকল্প।
কোন খাতে কত প্রকল্প? (শীর্ষ ৫ খাত)
উন্নয়ন পরিকল্পনায় গৃহায়ন ও যোগাযোগ খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:
১. গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা: ১৬০টি প্রকল্প (সর্বোচ্চ)।
২. পরিবহন ও যোগাযোগ: ১০২টি প্রকল্প।
৩. কৃষি খাত: ৯০টি প্রকল্প।
৪. শিক্ষা: ৭২টি প্রকল্প।
৫. পল্লী উন্নয়ন: ৬৯টি প্রকল্প। এছাড়াও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫৮টি এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪০টি প্রকল্পকে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মেগা ও আবাসন প্রকল্প
সবুজ পাতায় থাকা প্রকল্পের তালিকায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে:
- আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আবাসন: মিরপুর ৯ ও ১৬ নং সেকশনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের জন্য স্থায়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ।
- সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন: বেইলি রোডে অফিসার্স কোয়ার্টার, রমনায় মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এবং মতিঝিলে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ।
- প্রশাসনিক ভবন: সচিবালয়ে নতুন ২১ তলা অফিস ভবন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় (পূর্ত ভবন) নির্মাণ।
- সিটি করপোরেশন উন্নয়ন: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়নের জন্য একাধিক বড় প্রকল্প।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতা
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ জানিয়েছেন, সবুজ পাতায় প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা মানেই হলো এটি অনুমোদনের জন্য ‘লাইন’-এ দাঁড়িয়ে গেল। এর ফলে পরবর্তী পরিকল্পনা উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই প্রকল্পগুলো প্রক্রিয়াকরণ করা সহজ হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নতুন সরকার আসার ঠিক আগে এত বিপুল অংকের (১২ লাখ কোটি টাকা) প্রকল্পের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। নির্বাচিত সরকার এসব প্রকল্প পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করার অধিকার রাখলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে অনেক সময় তা কঠিন হয়ে পড়ে।
















