ভারতে সাপের কামড় একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান, যা বিশ্বজুড়ে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।
এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং অ্যান্টিভেনম ব্যবহারে জটিলতা। গ্লোবাল স্নেকবাইট টাস্কফোর্সের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে নানা সমস্যার মুখে পড়েন। অবকাঠামোর দুর্বলতা, পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের অভাব এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতিই এর প্রধান কারণ।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের প্রায় অর্ধেক জানান, চিকিৎসায় দেরির কারণে রোগীদের অনেকের অঙ্গচ্ছেদ, বড় অস্ত্রোপচার কিংবা আজীবন চলাচলের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে সাপের কামড়কে সবচেয়ে অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এর শিকার বেশি হন দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও আহতের হার বেশি বলে জানান চিকিৎসক যোগেশ জৈন। তার মতে, কৃষিকাজে যুক্ত মানুষ ও আদিবাসী সম্প্রদায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন।
২০২৪ সালে ভারত সরকার সাপের কামড় প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চালু করে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এতে নজরদারি, অ্যান্টিভেনম সরবরাহ, চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনসচেতনতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখনও অসম ও ধীরগতির।
চিকিৎসকদের মতে, সাপের বিষ কয়েক মিনিটের মধ্যেই রক্তে মিশে স্নায়ু, কোষ বা রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাত হানে। সময়মতো অ্যান্টিভেনম না পেলে শ্বাসকষ্ট, পক্ষাঘাত, স্থায়ী টিস্যু ক্ষতি বা অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গ্রামীণ এলাকায় খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থা, দূরবর্তী হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ প্রথমে ওঝা বা লোকজ চিকিৎসকের কাছে যান, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো অ্যান্টিভেনমের সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে ভারতে যে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়, তা মূলত চার ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক বিষধর সাপ রয়েছে, যাদের জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিভেনম নেই। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অজানা প্রজাতির সাপের কামড়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অঞ্চলভিত্তিক অ্যান্টিভেনম তৈরি, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সাপের কামড়কে বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্টযোগ্য রোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
চিকিৎসক যোগেশ জৈনের ভাষায়, সাপের কামড়ে মৃত্যু শুরু হয় যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার শেষ। দরিদ্র মানুষের জন্য দরিদ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়, তাদের আরও ভালো সেবা পাওয়ার অধিকার আছে।
















