ইসরায়েল যদি বর্তমান রাজনৈতিক ও নীতিগত পথে অগ্রসর হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশটি আর নিরাপদ ও প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের ভেতর ও প্রবাসী বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভিবাসনের প্রবণতা মিলিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে এবং জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে যাচ্ছে। এসব কারণে আগামী কয়েক দশকে ইসরায়েলের বর্তমান রূপ টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে—এমন নয়, বরং প্রশ্ন হলো এটি বর্তমান কাঠামোতে টিকে থাকবে কি না। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা বা পূর্ব জার্মানির মতো উদাহরণ দেখায়, রাষ্ট্র টিকে থাকলেও তার চরিত্র আমূল বদলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ভেতরের বিভাজনই সবচেয়ে বড় সংকট। ধর্মনিরপেক্ষ ও শিক্ষিত ইসরায়েলিরা দেশ ছাড়ছেন, যাঁরা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে বড় ভূমিকা রাখতেন। বিপরীতে, ধর্মীয় জায়নবাদী ও অতিরক্ষণশীল গোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে, যাঁরা তুলনামূলকভাবে অর্থনীতিতে কম অবদান রাখেন এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এই অভিবাসন প্রবণতার ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, বিনিয়োগ কমছে এবং কট্টর ডানপন্থী নীতির অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি বাড়াতে হচ্ছে, যা মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের দেশ ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মেরুকরণকে দায়ী করা হচ্ছে। যুদ্ধ, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা দুর্বল করার চেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা এই বিভাজন আরও বাড়িয়েছে।
এই উদ্বেগ কেবল সমালোচকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সাবেক প্রধান ও সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্র শতবর্ষ পূর্ণ করার আগেই বড় সংকটে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, সমাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত—ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি গোষ্ঠী, ধর্মীয় রাষ্ট্র চাওয়া গোষ্ঠী এবং ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা গোষ্ঠী। প্রথম দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কিছু বিশ্লেষক আরও এগিয়ে গিয়ে বলছেন, ইসরায়েল ইতোমধ্যেই তার আগের চরিত্র হারিয়েছে। তাঁদের মতে, দেশটি আর উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থাকা ইহুদি রাষ্ট্র নয়, বরং ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বর্ণবিভাজনমূলক শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
হেভারের মতে, ইসরায়েলের অবনতির সুযোগ নেই। টিকে থাকতে হলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কর্মশক্তি, প্রযুক্তি খাত এবং শক্তিশালী চিকিৎসা ও সামরিক অবকাঠামো ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের জীবনমান বজায় না রাখতে পারলে দেশত্যাগ আরও বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে এসব সূচকই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
অভিবাসন প্রসঙ্গে বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা ছিল কৌশলগত লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট ও গাজায় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তরুণ ও শিক্ষিত শ্রেণির বড় অংশ দেশ ছাড়ছে। সরকারি হিসাব ও গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেড় লক্ষাধিক মানুষ ইসরায়েল ছেড়েছেন।
এই অভিবাসন মূলত উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ আয়ের মানুষদের মধ্যে বেশি, যাঁরা বিদেশে সহজেই কাজ পান এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বেশি সচেতন। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের নিয়ে পরিবারগুলোর দেশ ছাড়ার প্রবণতাও বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগ কমেছে। অতিরক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ায় সামাজিক ব্যয়ও বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে এই ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা করদাতাদের জন্য টেকসই হবে না।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে থাকলে এবং বিনিয়োগ আরও কমলে ইসরায়েলের মূল করদাতা শ্রেণির ওপর চাপ অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের বড় অংশ বিদেশে চলে গেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও কমছে।
বর্তমানে ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় ধীর। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি ও প্রযুক্তি খাত কিছুটা ভরসা দিলেও আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও কট্টর ডানপন্থার উত্থান ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ও মেধাবীদের ধীর কিন্তু ধারাবাহিক দেশত্যাগ অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলের নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। কিছু পর্যবেক্ষকের ভাষায়, স্বৈরতন্ত্র হঠাৎ ভেঙে পড়ে, আর গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গিয়ে একসময় নিজের পরিচয় হারায়। ইসরায়েলও হয়তো সেই পথেই এগোচ্ছে।
















