বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি কি ধীরে ধীরে ভারতের কৌশলগত বলয় থেকে সরে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই এই আলোচনা জোরালো হয়েছে। ওই সময় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
শেখ হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং ভারতবিরোধী মনোভাবের প্রভাব বাড়ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সম্প্রতি ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম মুখ, কট্টরপন্থী কর্মী শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উগ্র ছাত্র সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা হাদি ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং তথাকথিত বৃহত্তর বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বিতর্কিত স্লোগান নতুন করে ছড়াতে দেখা যায়।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ থেকে সরে গিয়ে এমন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, এই নীতির ফলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক ভিত্তি হুমকির মুখে পড়ছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক আদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের পরিধি বাড়ায় এবং পরে অনুপস্থিতিতে বিচার করে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা সমালোচকদের মতে বিচার ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারকে স্পষ্ট করে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক শীর্ষ নেতার সাজা কার্যকর হয় এবং দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। তবে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর সুপ্রিম কোর্ট দলটির নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। পরবর্তীতে জামায়াত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দুর্বলতা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এর সরাসরি ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এতে ভারতবিরোধী পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, ইউনূস অভিজ্ঞ রাজনীতিক নন এবং তিনি যে শক্তির সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছেন, সেই গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবই ক্রমে বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর বাংলাদেশের ধারণা নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অংশ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি প্রতিনিধিদলের কাছে উপস্থাপিত একটি বইয়ের প্রচ্ছদে এমন মানচিত্র দেখানো হয়েছে বলে দাবি উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতবিরোধী বার্তা ছড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন সফরে গিয়ে ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থলবেষ্টিত উল্লেখ করে চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের প্রতি বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে চীন প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামীর একজন শীর্ষ নেতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানোয় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সহিংসতা পুনরাবৃত্তির ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ভারতের নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানপন্থী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। এমন পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
















