দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাত। একসময় সাময়িক লোডশেডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরিস্থিতি এখন দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন সংকটে রূপ নিয়েছে, যা শিল্পকারখানার দক্ষতা, রপ্তানির সময়ানুবর্তিতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা, সাভার, আশুলিয়া ও নরসিংদীর মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালন লাইনে চাপ নেমে এসেছে মাত্র শূন্য থেকে দুই পিএসআইয়ে। অথচ নিরবচ্ছিন্ন শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ১০ থেকে ১৫ পিএসআই। এর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সুতা উৎপাদন, রং ও ফিনিশিংয়ের মতো জ্বালানি-নির্ভর খাতে, যেখানে ধারাবাহিক বাষ্প সরবরাহ ছাড়া মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাচ প্রক্রিয়া সম্ভব নয়।
এর ফলে বহু কারখানায় যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকা, উৎপাদন চক্রে অস্থিরতা, রপ্তানি বিলম্ব এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দ্রুততা, বড় পরিসর ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই খাতে জ্বালানি অনিশ্চয়তা এখন সরাসরি বাণিজ্যিক দায়ে পরিণত হয়েছে।
প্রতিযোগিতার শক্তি থেকে কাঠামোগত দুর্বলতা
স্বল্প শ্রমমূল্য ও সস্তা গ্যাস—এই দুই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে শ্রম ব্যয় বাড়ছে এবং একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ অনির্ভরযোগ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে সেই সুবিধার একটি স্তম্ভ ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৫০০ স্পিনিং মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শুধু বস্ত্রখাত নয়, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পেও প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, যা সংকটের ব্যাপকতা স্পষ্ট করে।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর প্রান্তিক সমস্যা নয়; এটি শিল্প টিকে থাকার মূল নিয়ামকে পরিণত হয়েছে। নির্ভরযোগ্যতা, টেকসই উৎপাদন ও জ্বালানি স্বচ্ছতাকে যখন বৈশ্বিক ক্রেতারা ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, তখন সংস্কার না হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক জ্বালানি উদ্যোগ ও বাস্তবতা
সরকার গ্যাস কূপ খনন ও সংস্কারে নানা উদ্যোগ নিলেও এর সুফল এখনো শিল্পে পৌঁছায়নি। নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা, সীমিত পরিসরের সংস্কার ও এলএনজি আমদানি বাড়ানো সত্ত্বেও দৈনিক গ্যাস ঘাটতি প্রায় ৯০০ থেকে ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট রয়ে গেছে। ফলে স্পিনিং ও ডাইং কারখানাগুলোর সক্ষমতা ব্যবহার নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে।
ডিজেলের ওপর নির্ভরতা
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু ডিজেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ ব্যয়বহুল। গত তিন বছরে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ বাড়ায় ইউরোপীয় পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের টেকসই উৎপাদন মানদণ্ড পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল জ্বালানি কাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উচ্চ ব্যবহারের কারণে খরচ ও পরিবেশ—দু’দিকেই এগিয়ে আছে।
দেশীয় গ্যাস ও নীতিগত সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকট পুরোপুরি প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত নীতিগত ও কাঠামোগত। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনে ধীরগতি, আমদানি-নির্ভরতার প্রবণতা এবং بيرোক্র্যাটিক জটিলতা সংকটকে গভীর করেছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পরও এক দশকের বেশি সময় কোনো অফশোর ব্লক বরাদ্দ না দেওয়াকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ প্রায় ২,৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে সীমাবদ্ধ। এই ঘাটতি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপুল অঙ্কের এলএনজি আমদানি ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
নীতিগত দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
সরকারি শ্বেতপত্রে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনায় এখনো আমদানিনির্ভরতার প্রবণতা রয়ে গেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও করণীয়
বিশ্ববাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, শিল্প ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে গ্যাসের ওপর চাপ কমবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত চাহিদাও পূরণ হবে।
একই সঙ্গে দ্রুত কূপ সংস্কার, বিদ্যমান ক্ষেত্রের দক্ষতা বাড়ানো ও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন জোরদার করলে স্বল্পমেয়াদে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ছাড়া উৎপাদন, মান ও বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নতুন, বাস্তবভিত্তিক ও শিল্পবান্ধব জ্বালানি নীতিই পারে এই খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে।
















