কানাডার বানফ ও জ্যাসপার জাতীয় উদ্যানের বাইরে, দেশটির এক সময়ের অপ্রবেশ্য একটি অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য নতুন জানালা খুলে দিচ্ছে ১০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলপথভিত্তিক ট্রেইল। রকি টু নর্ডেগ রেল ট্রেইল নামে পরিচিত এই পথটি কানাডার অতীত ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতিকে একসূত্রে যুক্ত করছে।
নর্ডেগ নামের একসময়কার কয়লাখনি অধ্যুষিত জনপদ থেকে রকি মাউন্টেন হাউস শহর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথটি তৈরি হয়েছে বিশ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত কানাডিয়ান নর্দার্ন রেলওয়ের পুরোনো লাইনের ওপর। এক সময় এই রেলপথই ছিল পশ্চিম কানাডার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের প্রধান মাধ্যম। রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে জীবনযাত্রাও থমকে যেত।
নতুন এই ট্রেইলটি হাঁটাচলা, সাইকেল চালানো, ঘোড়ায় চড়া, শীতকালে স্নোশু ও ক্রস কান্ট্রি স্কিইংসহ নানা কাজে ব্যবহারযোগ্য করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভ্রমণকারীরা ঘন বন, জলাভূমি, উপত্যকা ও পাহাড়ঘেরা এমন সব এলাকায় পৌঁছাতে পারবেন, যেখানে আগে সাধারণ মানুষের প্রবেশ প্রায় ছিল না।
এ পর্যন্ত নর্ডেগ থেকে জ্যাকফিশ ক্রিক পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ প্রস্তুত হয়েছে। বাকি অংশের কাজ চলমান। স্থানীয়দের মতে, এই ট্রেইল প্রকৃতির নীরবতা ও নির্জনতার এক বিরল অভিজ্ঞতা দেয়, যা কানাডার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে এখন দুর্লভ।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই রেলপথ শুধু কয়লা পরিবহনই করেনি, বরং এর আশপাশে গড়ে উঠেছিল বহু জনপদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়লার চাহিদা কমে গেলে খনিগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৮৫ সালে রেল চলাচল বন্ধ হয়। পরের বছর রেলপথটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
২০০৯ সালে এই পরিত্যক্ত রেলপথ সংরক্ষণ করে পর্যটন করিডোরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং পরে আলবার্টা প্রদেশ সরকার এতে আর্থিক সহায়তা দেয়।
ট্রেইলটির একটি বড় আকর্ষণ হলো প্রায় ২২০ মিটার দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক লোহার সেতু, যা সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। সেতু থেকে নিচের গিরিখাত ও চারপাশের পাহাড়ি দৃশ্য বিশেষভাবে নজরকাড়া বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তারা বলছেন, এই ট্রেইল বানফ বা জ্যাসপারের মতো বিখ্যাত স্থানের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ দেয়, তবে ভিড় ছাড়াই। এতে পর্যটকেরা বেশি সময় নিয়ে অঞ্চলটি ঘুরে দেখার আগ্রহ পাবেন।
নর্ডেগ এলাকায় এখনো কয়লাখনি যুগের নানা নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। ট্রেইলের কাছেই একটি ঐতিহাসিক খনি কেন্দ্র আছে, যেখানে দর্শনার্থীরা অতীতের খনিশ্রম ও রেলপথের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারেন।
নতুন এই ট্রেইল কানাডার প্রকৃতি ও ইতিহাসকে একসঙ্গে তুলে ধরছে। পাহাড়, বন আর নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা ইস্পাতের রেললাইনগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই দেশ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়, বরং দূরবর্তী এসব করিডোরের শ্রম ও ইতিহাস দিয়েই গড়ে উঠেছে।
















