কিয়েভ—রুশ পাসপোর্টের লাল রঙটি তারাসের কাছে সব সময়ই অপছন্দের ছিল। সেটি বদলে নীল রঙের ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট পাওয়াই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে লেগেছে ১১ বছর, আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে দুবার।
চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনে বসবাসরত দেড় লাখের বেশি রুশ নাগরিকের একজন তারাস। তাঁদের বেশির ভাগই ইউক্রেনীয়দের আত্মীয় বা জীবনসঙ্গী, কেউ কেউ ইউক্রেনেই জন্মেছেন। আবার অনেকে রাশিয়ার বিরোধী মতাবলম্বী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন বা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন।
এই রুশ নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি নবায়ন কিংবা ইউক্রেনীয় নাগরিকত্ব পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু পাসপোর্টের রঙ দেখিয়েই তাঁদের অপমানের শিকার হতে হয়।
তারাস বলেন, লাল পাসপোর্ট থাকলে এখানে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না, ইউক্রেনীয় রক্ত থাকলেও, ইউক্রেনীয় ভাষা বললেও কিংবা সেনাবাহিনীতে সহায়তা করলেও।
পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজের শেষ নাম প্রকাশ করতে চাননি তারাস। তাঁর ভাইবোনেরা এখনো রাশিয়ায় থাকেন, ইউক্রেনীয় পরিচয়ের কারণে তারা যেন আরও বিপদে না পড়েন, সেটিই তাঁর আশঙ্কা।
১৯৮০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনের পলতাভায় জন্ম তারাসের। সেনা কর্মকর্তা বাবার কারণে শৈশব কেটেছে বর্তমান রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে। গ্রীষ্মের ছুটিতে পলতাভার কাছে গ্রামে গিয়ে দাদা–দাদির কাছে ইউক্রেনীয় ভাষা ও সংস্কৃতি শিখতেন তিনি।
১৬ বছর বয়সে রুশ পাসপোর্ট পান তারাস। পরে সেন্ট পিটার্সবার্গে শিল্পকলা ও নকশা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের এক বছর পর তিনি পলতাভায় চলে আসেন।
প্রথম দিকে বসবাসের অনুমতি ও নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ হলেও রুশ পাসপোর্ট ছাড়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখেন তিনি। তারাস বলেন, এই দেরিই তাঁকে সময়, অর্থ ও মানসিক শান্তির বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর কিয়েভ ও মস্কোর কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এতে রুশ নাগরিকদের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে। তখন ইউক্রেনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ ছিল এবং আবেদনকারীদের দুই বছরের মধ্যে আগের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ দিতে হতো।
রুশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া ছিল আরও কঠিন। কোনো মামলা, দেনা কিংবা আবাসিক নিবন্ধন নেই—এমন নানা শর্ত পূরণ করতে হতো। কাগজপত্র জমা দিতে তারাসকে প্রতিবেশী মলদোভায় গিয়ে রুশ দূতাবাসে হাজির হতে হয়। সেখানে তাঁকে অবহেলা করা হয়, কাগজপত্র হারিয়ে ফেলা হয় এবং কটূক্তিও সহ্য করতে হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
অনেকের অবস্থা তারাসের চেয়েও খারাপ। মেয়াদোত্তীর্ণ আবাসিক অনুমতি নবায়নে অস্বীকৃতি, পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে তৃতীয় দেশে বারবার যাতায়াত—এসব সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরোলে কারও কারও ইউক্রেনীয় নাগরিকত্বও বাতিল করা হয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনের পার্লামেন্ট অভিবাসন আইন সংশোধন করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আরও এক মাস সময় দেওয়ার বিধান করে। কিন্তু তত দিনে তারাস ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করে তিনি নাগরিকত্বের পক্ষে রায় পান। কর্মকর্তারা প্রথমে আপত্তি তুললেও জরিমানার আদেশের পর পাসপোর্ট দিতে বাধ্য হন। গত আগস্টে অবশেষে তিনি ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট হাতে পান।
তবে অনেক রুশ নাগরিক এখনো যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান। আবার কেউ কেউ হতাশ হয়ে প্রতীকী প্রতিবাদে নামছেন। জানুয়ারির শুরুতে কিয়েভের এক বাসিন্দা তাঁর স্ত্রীর রুশ পাসপোর্ট রান্নাঘরের চুলায় পুড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি ছিল, যুদ্ধ ও বিদ্যুৎ–পানির সংকটের মধ্যে এমন অনিশ্চিত পরিচয় মানসিকভাবে অসহনীয়।
ইউক্রেনে রুশ নাগরিকদের এই আইনি অচলাবস্থা শুধু কাগজপত্রের সমস্যা নয়, বরং পরিচয়, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















