যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে এতটা আগ্রাসী ও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন, তা অনেকেই শুরুতে আঁচ করতে পারেননি। কিন্তু শপথ নেওয়ার পরপরই নির্বাহী আদেশের ধারাবাহিকতায় এমন সব সিদ্ধান্ত নেন তিনি, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ থামানোর ঘোষণা দিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি নতুন করে শুরু করেন শুল্কযুদ্ধ, যার প্রভাব পড়তে থাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। এর ফলে একের পর এক বিশ্বনেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে নামতে দেখা যায়।
নিজেকে বিশ্বশান্তির রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে ট্রাম্প কখনো ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন, আবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। একই সময়ে তিনি ইসরাইলের পক্ষে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন। যদিও এতে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি, তবুও ইরানের সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য ও হুমকি তিনি অব্যাহত রাখেন। পরে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে সহায়তার পর আবার যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রাখার কৃতিত্বও দাবি করেন।
২০২৬ সালের শুরুতেই সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাত্রা আরও বাড়ান ট্রাম্প। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, যুদ্ধবিমান মহড়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি দিতে থাকেন। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা জোরালো হয়ে ওঠে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমতে না কমতেই ট্রাম্প নতুন করে নজর দেন আর্কটিক অঞ্চলে। গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগও করা হতে পারে। পরে সে বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও ইউরোপজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়।
এরই মধ্যে গাজা পুনর্গঠনের নামে ট্রাম্প ঘোষণা দেন একটি নতুন উদ্যোগের, যার নাম দেওয়া হয় বোর্ড অব পিস। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি জাতিসংঘের কার্যকারিতা খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নতুন বৈশ্বিক কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা। দাভোসে এই উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে এর চেয়ারম্যান হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং গাজাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তার নীতির বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ালে নিষেধাজ্ঞা, শুল্কারোপ কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের পথ বেছে নিতে তিনি দ্বিধা করছেন না। ইতিহাসের সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মতো আচরণ করে তিনি যেন নিজেকে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে চাইছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই আগের প্রশাসনের বহু নির্বাহী আদেশ বাতিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, অভিবাসন কঠোর করা এবং ইসরাইলি বসতিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে শুল্কারোপের মাধ্যমে তিনি একের পর এক দেশকে চাপে ফেলেন। চীন ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দিলেও ভারত ও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখেন।
গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার কৃতিত্ব দাবি করলেও বাস্তবে সেখানে হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধের ভয়াবহতায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে কিউবা ও অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশের প্রতিও হুমকির সুর শোনা যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠোর। পরমাণু স্থাপনায় হামলা, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে উসকানি এবং সামরিক হুমকি দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে অস্থির করে তুলছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি এই শঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
ইউরোপে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য ন্যাটো জোটের মধ্যেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্কের আপত্তি সত্ত্বেও সামরিক বিকল্পের কথা বলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। এর জবাবে ট্রাম্প শুল্কারোপের হুমকি দেন।
সব মিলিয়ে শুল্ক, সামরিক শক্তি, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকির সমন্বয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে তিনি আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তিগুলোর প্রতিরোধও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা ট্রাম্পকে আরও একরোখা ও ভয়ংকর করে তুলছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
















