মন্ট্রিয়াল, কুইবেক – কুইবেক সিটির একটি মসজিদে ভয়াবহ হামলার নয় বছর পূর্তিতে কানাডার মুসলিম নেতারা ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও বিভাজনমূলক রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ঘৃণাভিত্তিক ভাষা ও ভয়ের রাজনীতি মানুষের প্রাণ পর্যন্ত নিতে পারে।
কানাডিয়ান মুসলিমদের জাতীয় পরিষদের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ব্রাউন বলেন, এই বার্ষিকী মনে করিয়ে দেয় যে কানাডায় ইসলামবিদ্বেষ নিরীহ কোনো বিষয় নয়। তার ভাষায়, এটি বাস্তব ক্ষতি ডেকে আনে এবং মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এই স্মরণ দিবস ঘৃণার পরিণতি ভুলে না যাওয়ার বার্তা দেয়।
২০১৭ সালের ২৯ জানুয়ারি কুইবেক সিটির ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর বন্দুকধারীর হামলায় ছয়জন মুসলিম নিহত হন। এটি কানাডার ইতিহাসে কোনো উপাসনালয়ে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও নিন্দা ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলিমবিদ্বেষ ও চরমপন্থার উত্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এই হামলার পর কানাডা সরকার ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী আক্রমণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলার অঙ্গীকার করে। ২০২১ সালে ২৯ জানুয়ারিকে কুইবেক সিটি মসজিদ হামলা স্মরণ ও ইসলামবিদ্বেষবিরোধী জাতীয় দিবস ঘোষণা করা হয়।
তবে ব্রাউন বলেন, প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার শিক্ষা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তার মতে, হামলার পর সমাজে ক্ষত সারানোর ও সেতুবন্ধ গড়ার যে চেষ্টা ছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে কুইবেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বার্থে ভীতি ছড়ানোর প্রবণতা আবারও বাড়ছে।
তিনি কুইবেকের ক্ষমতাসীন দল ভবিষ্যৎ কুইবেক জোট সরকারের কয়েকটি আইনের কথা উল্লেখ করেন, যেগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে প্রণীত। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মীদের কর্মস্থলে ধর্মীয় প্রতীক পরিধানে নিষেধাজ্ঞা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুশীলন সীমিত করার উদ্যোগ।
কুইবেক সরকার এসব আইনকে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব পদক্ষেপ বৈষম্যকে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে বৈধতা দিচ্ছে এবং বিশেষ করে মুসলিম নারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্রাউনের মতে, এই ধরনের আইন ও বক্তব্য সমাজে এমন বার্তা দেয় যে দৃশ্যমানভাবে ধর্ম পালন করা মুসলিম হওয়াটা বিপজ্জনক বা ভুল কিছু। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতাসীনদের ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ঘৃণাপ্রবণ মানুষদের সহিংসতায় উৎসাহিত করতে পারে।
ফেডারেল পর্যায়ে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় নিযুক্ত বিশেষ প্রতিনিধি আমিরা এলঘাওয়াবি জানান, সরকার ঘৃণার বিরুদ্ধে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অর্থায়ন করছে। তবে তার মতে, কানাডায় ইসলামবিদ্বেষ এখনও বাড়ছে, যা কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধ পরিসংখ্যানে স্পষ্ট।
সরকারি তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এলঘাওয়াবি বলেন, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে ঘৃণা এখনো কানাডীয় সমাজের জন্য হুমকি।
তিনি আরও বলেন, কুইবেক মসজিদ হামলার স্মরণ শুধু অতীতের শোক নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সচেতন থাকার আহ্বান। নিহতদের পরিবার চায়, তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যু যেন বৃথা না যায় এবং কানাডাবাসী সবাই মিলে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
তার কথায়, অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্ত করতে পারে।
















