দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আলোচনার পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে, যাকে উভয় পক্ষই ‘সবচেয়ে বড় চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই এই সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর তাৎপর্য আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তির আওতায় ভারত ও ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা বাড়বে। এতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার একীভূত হচ্ছে, যার সম্মিলিত অর্থনৈতিক আকার প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক চতুর্থাংশ।
নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের জনগণের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে এবং দুই অঞ্চলের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লায়েনও বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে দুই বিলিয়ন মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তি। এর ফলে ভারতের পণ্য ও সেবার জন্য ইউরোপের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং একই সঙ্গে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতের বাজার আরও উন্মুক্ত হবে।
চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের জন্য একাধিক খাতে শুল্ক কমাবে বা তুলে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে বস্ত্র, চামড়া, জুতা, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, রত্ন ও গহনা, সামুদ্রিক খাদ্য এবং ওষুধ। অন্যদিকে ভারতও ইউরোপীয় পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাসে সম্মত হয়েছে।
বিশেষভাবে আলোচিত বিষয় হলো ভারতের গাড়ি খাত। দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষিত থাকা এই খাতে ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হবে। তবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক বছর ছাড় দেওয়া হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের বছরে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর শুল্ক সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি আর্থিক সেবা, সামুদ্রিক পরিবহন ও টেলিযোগাযোগ খাতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ভারতের বাজারে আরও সহজ প্রবেশাধিকার পাবে।
ভারতের জন্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্য বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় নয়াদিল্লি নতুন বাণিজ্য অংশীদার খোঁজার দিকে জোর দিয়েছে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সবচেয়ে বড় পণ্য বাণিজ্য অংশীদার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে এবং আগামী কয়েক বছরে তা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে চুক্তির চূড়ান্ত কার্যকারিতা পেতে এখনো আইনি যাচাই ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর থেকে এই সমঝোতা পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও ইউরোপের এই বাণিজ্য চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটে দুই বড় অর্থনৈতিক শক্তির এই ঘনিষ্ঠতা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
















