মানবসভ্যতা ধ্বংসের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে সতর্ক করেছেন পরমাণু বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালের জন্য প্রলয়ের প্রতীকী ঘড়ি নির্ধারণ করা হয়েছে মধ্যরাতের মাত্র ৮৫ সেকেন্ড আগে, যা ১৯৪৭ সালে এই ঘড়ি চালু হওয়ার পর সবচেয়ে অন্ধকার মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরমাণু বিজ্ঞানীদের সংগঠন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তন ও জৈবপ্রযুক্তি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংগঠনটির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্রা বেল বলেন, প্রলয়ের ঘড়ির বার্তা একেবারেই স্পষ্ট। ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়ছে, সহযোগিতা কমছে এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তিনি বলেন, পরিবর্তন প্রয়োজন এবং তা সম্ভবও, তবে এজন্য বিশ্ববাসীকে তাদের নেতাদের কাছ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করতে হবে।
ঘড়ি এগিয়ে আনার ব্যাখ্যায় সংগঠনটি জানায়, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি শক্তিধর দেশ ক্রমেই আগ্রাসী, বৈরী ও জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক সমঝোতা ভেঙে পড়ছে এবং তার জায়গায় বিজয়ী-সর্বস্ব পরাশক্তির প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের কয়েকটি সংঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ এবং জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা।
জলবায়ু সংকট প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া কখনো পুরোপুরি অপ্রতুল, আবার কখনো চরমভাবে ক্ষতিকর ছিল।
সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, সাম্প্রতিক জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানি ধীরে ধীরে বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি এবং কার্বন নিঃসরণ নজরদারির ওপরও জোর দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে যে ২০২৪ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির উৎপাদন ও সক্ষমতা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। প্রথমবারের মতো নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানি মিলিয়ে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
প্রলয়ের ঘড়ি মূলত মানবজাতি বিলুপ্তির কতটা কাছাকাছি রয়েছে, তার প্রতীক। ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত থেকে সর্বোচ্চ ১৭ মিনিট দূরে ছিল। সবচেয়ে নিরাপদ সময় ধরা হয় ১৯৯১ সালকে, যখন শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর উদ্যোগ নেয়।
এর বিপরীতে ১৯৮৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সংলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘড়ি তিন মিনিটে নেমে এসেছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে পারমাণবিক যুদ্ধের মতোই বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার ফলে ঘড়ি ক্রমেই মধ্যরাতের দিকে এগোচ্ছে।
নতুন মূল্যায়ন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল হোলজ বলেন, জাতীয়তাবাদী স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আস্থা ও সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু বিশ্ব যদি ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজনে ভেঙে পড়ে, তাহলে সবাই আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
















