ভারতে অনুষ্ঠেয় টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ক্রিকেট কূটনীতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তানও টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আইসিসির সঙ্গে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর শনিবার বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও পরে তারা ভারতে নির্ধারিত ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে এই অনুরোধ করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ ওঠে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে জানায়, তারা এখনই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহসিন নকভি সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তিনি জানান, আগামী শুক্রবার বা সোমবার পাকিস্তানের অবস্থান চূড়ান্ত করা হবে। পাকিস্তানের সব বিশ্বকাপ ম্যাচ ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কায় নির্ধারিত হয়েছে, কারণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ।
বাংলাদেশ–ভারত–পাকিস্তান বিতর্কের সূচনা হয় তিন সপ্তাহ আগে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দাবি করে, ভারতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে আইপিএলে খেলা বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে হঠাৎ দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতিকে দায়ী করা হয়।
বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, যদি একজন খেলোয়াড় ভারতে নিরাপদ না হন, তাহলে পুরো দল ও সাপোর্ট স্টাফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে আইসিসি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।
এর আগেও আইসিসি ভারত ও পাকিস্তানের জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যু ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভারত নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ায় সেই সুবিধা পেয়েছিল। বাংলাদেশ একই ধরনের সুবিধা চাইলে তা না দেওয়ায় আইসিসির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান একমাত্র পূর্ণ সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়। আইসিসির বোর্ড সভায় অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের পরিবর্তে বিকল্প দল নেওয়ার পক্ষে মত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের পেছনে ক্রীড়ার পাশাপাশি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে, অন্যদিকে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নতির পথে এগোয়।
পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, একটি দেশের জন্য এক নিয়ম আর অন্য দেশের জন্য ভিন্ন নিয়ম হতে পারে না। তার মতে, বাংলাদেশ অন্যায়ের শিকার হয়েছে এবং তাদের বিশ্বকাপে খেলার অধিকার রয়েছে।
এদিকে পাকিস্তান সম্ভাব্যভাবে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচ বর্জন করতে পারে—এমন জল্পনাও উঠেছে। তবে সাবেক আইসিসি চেয়ারম্যান এহসান মানি পাকিস্তানকে টুর্নামেন্ট থেকে সরে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, এতে খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি অযথা জড়িয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিসির ওপর ভারতের আর্থিক প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে সংস্থাটি নিরপেক্ষতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের অবস্থানকে নীতিগত সমর্থন হিসেবে দেখা হলেও সরাসরি বর্জনের পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
এই বিতর্কের চূড়ান্ত প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ক্রিকেটের মাঠে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
















