ঢাকা-চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গ রুটে সক্রিয় শক্তিশালী চক্র; ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে নতুন ছক
“মনুষ্যত্বের বিনাশ ঘটে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে”—এই চিরায়ত সত্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অজ্ঞান পার্টি’ ও ‘মলম পার্টি’। নিছক ব্যক্তিস্বার্থে সহযাত্রীকে বিষাক্ত রাসায়নিক খাইয়ে কিংবা চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার এই অমানবিক সংস্কৃতি যেন পিছু ছাড়ছে না। বিশেষ করে রেলপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং পঞ্চগড়-ঢাকা রুটে এদের উপস্থিতি এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে রেল পুলিশ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই চক্রগুলো আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঘরমুখী যাত্রীদের টার্গেট করে নতুন করে জাল বুনছে। ডিজিটাল বাংলাদেশেও ‘দো পেয়ে দৈত্য’ হিসেবে পরিচিত এই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনি কঠোরতার পাশাপাশি যাত্রীদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই এখন একমাত্র রক্ষাকবচ।
সড়ক, রেল ও নৌপথে প্রতিদিন শত শত যাত্রী এই চক্রের শিকার হলেও আইনি জটিলতা ও সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ ঘটনাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
যেভাবে ফাঁদ পাতে ‘অজ্ঞান পার্টি’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত সুকৌশলী এবং তাদের আচরণ অত্যন্ত বিনয়ী। তাদের কার্যক্রমের ধাপগুলো হলো:
- বন্ধুত্বের ছল: স্টেশনে বা বাসের কাউন্টারে ওত পেতে থাকা সদস্যরা প্রথমে যাত্রীর পাশে বসে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ জুড়ে দেয়।
- খাবারে বিষক্রিয়া: আলাপ জমে উঠলে তারা চকলেট, শরবত, আচার, বিস্কুট কিংবা ডাব অফার করে। এসব খাবারে মেশানো থাকে উচ্চমাত্রার চেতনানাশক বা ঘুমের ওষুধ।
- সর্বস্ব লুট: যাত্রী অচেতন হওয়া মাত্রই তার টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে চক্রের সদস্যরা পরবর্তী স্টেশনে বা পথে নেমে চম্পট দেয়।
রেলপথের ‘হটস্পট’ ও পুলিশের অসহায়ত্ব
ট্রেনের সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক ভ্রমণের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। ভুক্তভোগীদের মতে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে এদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। রেল পুলিশ জানাচ্ছে:
১. জনবল সংকট: বিপুল সংখ্যক যাত্রীর বিপরীতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য না থাকায় প্রতিটি বগিতে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।
২. অভিযোগের অভাব: লোকলজ্জা বা ঝামেলার ভয়ে অধিকাংশ ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করেন না, ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
৩. মলম পার্টির হানা: শুধুমাত্র খাইয়ে নয়, বরং চোখে বিশেষ রাসায়নিক বা মরিচের গুঁড়ো মেখে ‘মলম পার্টি’ চোখের পলকে যাত্রীকে অন্ধপ্রায় করে লুটতরাজ চালাচ্ছে।
ঈদযাত্রা ও আসন্ন বিপদ
আসন্ন রমজান ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এই চক্রগুলো রাজধানী ছাড়ার সব রুটেই সক্রিয় হচ্ছে। উৎসবের মৌসুমে মানুষের কাছে নগদ টাকা বেশি থাকে বলে তারা এই সময়টিকে ‘পিক সিজন’ হিসেবে বেছে নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানাচ্ছে, এবার স্টেশনে স্টেশনে মাইকিং এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হলেও যাত্রীদের সহায়তা ছাড়া এটি নির্মূল করা অসম্ভব।
পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে যাত্রীদের নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
- অচেনা সহযাত্রী: যাত্রাপথে অতি-উৎসাহী বা অতিরিক্ত বিনয়ী সহযাত্রীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
- খাবার গ্রহণ: অপরিচিতের দেওয়া কোনো পানীয় বা শুকনো খাবার—এমনকি পানিও পান করবেন না।
- আইনি পদক্ষেপ: কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেখলে সাথে সাথে দায়িত্বরত পুলিশ বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন।
















