যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে চীনকে আর শীর্ষ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখানো হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম গোলার্ধে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গত এক দশকের নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা কৌশল নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার দায় আরও বেশি ভাগ করে নিতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়াসহ ইউরোপ ও এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বক্তব্যের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩৪ পৃষ্ঠার এই কৌশলপত্রটি প্রকাশিত হয় ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পর। সেখানে উনিশ শতকের মনরো নীতির পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
নতুন কৌশলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো যুক্তরাষ্ট্রের মূল নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হিসেবে নিজ ভূখণ্ড ও পশ্চিম গোলার্ধকে চিহ্নিত করা। এতে চারটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নির্ভরতা কমাতে উৎসাহ দেওয়া, প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা এবং চীনের ক্ষেত্রে মোকাবিলার বদলে নিরুৎসাহমূলক কৌশল গ্রহণ।
প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তির অবস্থান থেকে পরিচালিত হবে, সরাসরি সংঘাতের পথে নয়। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আর এককভাবে সব জায়গায় নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে না এবং মিত্রদের ঘাটতি পুষিয়ে দেবে না।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে উত্তর আমেরিকার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো কৌশলগত অঞ্চলে সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নতুন নথিতে আগের প্রশাসনের কৌশলের সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। পূর্ববর্তী নীতিতে চীন ও রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন কৌশলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে এবং ইউক্রেনকে সহায়তায় তাদের নেতৃত্বের কথাও বলা হয়েছে।
ইরান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত রেখে বলা হয়েছে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে আদর্শ মিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই কৌশলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর। ইউরোপকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার সামরিক হুমকি স্বীকার করা হলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, সিউল নিজেই প্রধান প্রতিরোধের দায়িত্ব নিতে সক্ষম।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সংখ্যা ভবিষ্যতে কমতে পারে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সিউল প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে এবং নিজেদের সক্ষমতা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল মিত্রদের নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিক উপস্থিতি বজায় রাখবে, তবে আগের মতো পুরো ব্যয় বহন করবে না।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে নতুন নথিতে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বজায় রেখে চীনের প্রভাব ঠেকানোর কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা চীনকে আধিপত্য বিস্তার করতে দেবে না, তবে গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ খোলা রাখতে চায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কৌশলকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরে যাওয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এতে ইঙ্গিত মিলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, যেখানে চীন একক প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না।
















