বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফিটনেস প্রতিযোগিতা হাইরক্স। চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে প্রায় তেরো লাখ মানুষ। দৌড় ও শক্তি ব্যায়ামের সমন্বয়ে গড়া এই ইভেন্ট বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে তরুণ মিলেনিয়াল ও জেন জেড প্রজন্মকে, যাদের বয়স সাধারণত কুড়ির কোঠা থেকে চল্লিশের শুরুর দিক পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই হাইরক্সের দ্রুত বিস্তারের প্রধান কারণ। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের কাছে ফ্যাশনেবল পোশাকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই দামি ফিটনেস ব্র্যান্ডের মিলিয়ে নেওয়া পোশাক পরে দলগতভাবে প্রতিযোগিতায় নামছেন।
পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন খাতে কর্মরত আলানা ফ্যালকনার ২০২৩ সাল থেকে হাইরক্সে অংশ নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ছয়টি দেশে বারোটি শহরে তিনি বিশটিরও বেশি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। তার ভাষায়, হাইরক্সে অংশ নেওয়ার পর তিনি এতে পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তার বেশিরভাগ ভ্রমণই এখন প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে।
২৯ বছর বয়সী আলানা জানান, গত বছর শিকাগোতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে তার সর্বোচ্চ দুই হাজার পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হয়েছিল। সাধারণত বিদেশে একটি প্রতিযোগিতার জন্য দুই রাত থাকা ও যাতায়াত মিলিয়ে চারশ পাউন্ড এবং টিকিট বাবদ আরও প্রায় একশ বিশ পাউন্ড খরচ হয় বলে জানান তিনি। ঘন ঘন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় জুতা ও অন্যান্য ফিটনেস সরঞ্জামেও বিপুল ব্যয় হচ্ছে বলে তার মন্তব্য।
লন্ডনের একটি জিমের প্রতিষ্ঠাতা এভগেনিয়া কোরোলেভা বলেন, যারা ফিটনেস প্রতিযোগিতাকে সিরিয়াসভাবে নেয়, তাদের জন্য খরচ সত্যিই আকাশচুম্বী হতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, একটি হাইরক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একজন অ্যাথলেট এক সপ্তাহান্তেই পাঁচশ থেকে এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন।
তার মতে, হাইরক্স এক ধরনের নেশা তৈরি করে, কারণ প্রথম প্রতিযোগিতার পর অধিকাংশ মানুষ আর থেমে থাকতে পারে না। একই ধরনের কোর্স হওয়ায় অংশগ্রহণকারীরা নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নামেন, যা তাদের আরও উৎসাহিত করে।
তবে খরচ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, শুধু দৌড়ানো ও ক্লান্ত হওয়ার জন্য এত অর্থ ব্যয় করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ফ্রান সির্ল বলেন, এ ধরনের প্রতিযোগিতা অনেকের কাছে ভীতিকর মনে হতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, সুস্থ থাকতে বিশেষ সরঞ্জাম বা ব্যয়বহুল কিটের প্রয়োজন নেই।
তার মতে, ব্যায়াম সস্তা ও সহজও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন কিছু খুঁজে পাওয়া, যা মানুষকে বারবার করতে আগ্রহী করে তোলে।
তবে বেশিরভাগ প্রতিযোগীর মতে, বড় ভেন্যু ভাড়া, বিশেষ সরঞ্জাম ও বিচারক প্যানেলের খরচ বিবেচনায় নিলে হাইরক্সের মূল্য কাঠামো ন্যায্য। এভগেনিয়ার ভাষায়, এটি তরুণদের মধ্যে ব্যায়ামকে জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখার একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন।
ফিটনেস অ্যাপের জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন জেড প্রজন্মের এক তৃতীয়াংশ এ বছর ব্যায়ামে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে চায়। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, তারা ডেটে যাওয়ার চেয়ে নতুন জিম পোশাকে টাকা খরচ করতেই বেশি আগ্রহী।
এখন ম্যারাথন ভ্রমণ বা হাইরক্সকে কেন্দ্র করে ছুটির পরিকল্পনা এতটাই জনপ্রিয় যে কিছু ভ্রমণ সংস্থা বিশেষভাবে এসব প্রতিযোগিতার জন্য প্যাকেজ দিচ্ছে। যুক্তরাজ্যে হাইরক্সের আসরগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বিদেশে গিয়ে অংশ নিচ্ছেন।
২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা হাইরক্সে নারী ও পুরুষ অংশগ্রহণের হার প্রায় সমান। এই প্রতিযোগিতায় এক কিলোমিটার দৌড় মোট আটবার করতে হয়, যার ফাঁকে থাকে বিভিন্ন শক্তি ব্যায়াম।
শারীরিক কার্যক্রম ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা এক গবেষক জানান, বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের সমন্বয়ের কারণে এই প্রতিযোগিতা অনেকের কাছে নেশার মতো হয়ে উঠতে পারে। তবে অতিরিক্ত অনুশীলনে চোটের ঝুঁকির কথাও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।
আরেক প্রতিযোগী জোরেল হিল জানান, ২০২৪ সালের শেষে প্রথমবার অংশ নেওয়ার পর থেকেই তিনি হাইরক্সে মেতে উঠেছেন। আগে তার জীবন ছিল বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও বাইরে বেরোনো ঘিরে, এখন প্রায় সব ছুটিই কাটে ফিটনেস প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণে।
তার ভাষায়, নতুন পোশাক বা বিনোদনে খরচ না করে এখন তিনি ফিটনেস সরঞ্জামেই বেশি বিনিয়োগ করছেন। তার মতো অনেক তরুণের কাছেই ব্যায়াম এখন শুধু শরীরচর্চা নয়, বরং পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
















