ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশবিরোধী অপতথ্যের উদ্বেগজনক বিস্তার
বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় উৎস থেকে ছড়ানো অপতথ্য ২০২৫ সালে আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত আকার নিয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—উভয় ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা জনমত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্যের প্রবণতা ২০২৫ সালে আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর ভারতীয় উৎস থেকে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।
এই অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৮টি ঘটনায় ভারতের ৭৩টি সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশকে জড়িয়ে মোট ১৪০টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বছরের শুরুতেই অপতথ্যের ঊর্ধ্বগতি
রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতেই অপতথ্যের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। জানুয়ারি মাসেই ৩৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ। মে মাসে সংখ্যা কিছুটা কমে চারটিতে নামলেও পুরো বছরজুড়ে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত ১৩টি করে অপতথ্য ছড়িয়েছে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমগুলো।
এক্সে অপতথ্যের আধিপত্য
বাংলাদেশ নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবারও সামনে এসেছে মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্স। শনাক্ত ১৫৫টি অপতথ্যের মধ্যে ১২৬টিই এক্সে ছড়ানো হয়েছে, যা মোটের প্রায় ৮১ শতাংশ। এ ছাড়া ফেসবুকে ৫৪টি, পাশাপাশি ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস ও টিকটকেও অপতথ্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের লাগামহীন বিস্তার
২০২৫ সালে শনাক্ত অপতথ্যের মধ্যে ৯১টিই ছিল সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির, যা মোটের প্রায় ৫৮ শতাংশ। এসব অপতথ্যের বড় অংশই ছড়ানো হয়েছে এক্সের মাধ্যমে। সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারে অন্তত ১০টি ঘটনায় ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে হামলা বা সহিংসতার শিকার মুসলিম ব্যক্তিকে হিন্দু পরিচয়ে উপস্থাপন করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এমন অন্তত ৩৩টি ঘটনা শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এ ছাড়া পুরোনো বা ভিন্ন দেশের ঘটনাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে প্রচারের ঘটনাও রয়েছে।
৭৩ গণমাধ্যমে ১৪০ ভুল প্রতিবেদন
রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অন্তত ১৪০টি ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০টি পর্যন্ত অপতথ্য ছড়ানোর নজির পাওয়া গেছে।
রিউমর স্ক্যানার বলছে, এই পরিসংখ্যান পূর্ণ চিত্র নয়। যেসব দাবি ফ্যাক্টচেকের আওতার বাইরে রয়ে গেছে, সেগুলো যুক্ত হলে প্রকৃত অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম থেকে ছড়ানো অপতথ্য সাধারণ মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্যতা পায় এবং তা জনমত ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে।
















