রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের এক হাজার চারশ একত্রিশতম দিনে যুদ্ধক্ষেত্র ও কূটনীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার গভীর রাতে ইউক্রেনজুড়ে বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া। সরকারি তথ্যে জানানো হয়, রাজধানী কিয়েভে অন্তত একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। সারা দেশে প্রায় বারো লাখ বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। কিয়েভের সামরিক প্রশাসন জানায়, শহরের অন্তত চারটি জেলায় হামলার প্রভাব পড়ে এবং একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্বিরিদেনকো জানান, রাজধানীর পাশাপাশি দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের চারটি অঞ্চলে হামলা চালানো হয়েছে।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, শহরের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় ত্রোইয়েশচিনা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে প্রায় ছয়শ ভবনে বিদ্যুৎ, পানি ও তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানায়, রাশিয়া মোট তিনশ পঁচাত্তরটি ড্রোন ও একুশটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, যার মধ্যে বিরলভাবে ব্যবহৃত দুটি জিরকন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল।
একই হামলায় ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে অন্তত ত্রিশজন আহত হন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। মেয়র ইগর তেরেখভ জানান, শহরের বিভিন্ন জেলায় পঁচিশটি ড্রোন আঘাত হানে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি ছাত্রাবাস এবং দুটি চিকিৎসাকেন্দ্র, যার একটি মাতৃসদন।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী দেনিস শমিহাল জানান, কিয়েভে এখনো আট লাখের বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন রয়েছে। রাজধানীর উত্তরের চেরনিহিভ অঞ্চলেও আরও চার লাখ পরিবার বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। উপপ্রধানমন্ত্রী ওলেক্সি কুলেবা জানান, কিয়েভে রাত পর্যন্ত তিন হাজার দুইশর বেশি ভবনে গরমের ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। রাতে তাপমাত্রা নেমে আসে মাইনাস দশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এই হামলাকে ‘বর্বর’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার মধ্যেই এমন হামলা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘নিষ্ঠুর মানসিকতার’ প্রমাণ।
এদিকে রাশিয়ার বেলগোরোদ সীমান্ত অঞ্চলে শনিবার ইউক্রেনীয় বাহিনীর বড় ধরনের হামলার কথা জানানো হয়েছে। স্থানীয় গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ গ্লাদকভ বলেন, এতে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো প্রাণহানি হয়নি। তিনি একে বেলগোরোদ শহরের ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গোলাবর্ষণ বলে উল্লেখ করেন। ধ্বংস হওয়া একটি ড্রোনের টুকরো পড়ে একটি ভবনের আঙিনায় আগুন লাগে বলেও জানান তিনি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, খারকিভ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী গ্রাম স্তারিৎসিয়া সম্পূর্ণভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানায়, ওই এলাকায় রুশ বাহিনী ছয়টি হামলা চালিয়েছে, যদিও গ্রামটি দখলের বিষয়টি তারা স্বীকার করেনি।
কূটনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার দ্বিতীয় দিনের আলোচনা কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে আবারও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, আলোচনার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য কাঠামো। তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেননি।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় পারস্পরিক সম্মান দেখা গেছে এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। ভবিষ্যতে মস্কো বা কিয়েভে আরও বৈঠক হতে পারে বলেও তিনি জানান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক সরকারি মুখপাত্র বলেন, আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনা হয়েছে, যা প্রায় চার বছরের যুদ্ধে বিরল ঘটনা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি কাঠামোর কিছু অমীমাংসিত দিক নিয়ে কথা হয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইস্তাম্বুলে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং সংলাপ অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
















