ডিপফেক আতঙ্কে নির্বাচনী রাজনীতি
নির্বাচনের প্রাক্কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও ও ফটোকার্ড রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এসব কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে ভোটাররা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অপপ্রচারের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, কণ্ঠ নকল করা অডিও ক্লিপ এবং মূলধারার গণমাধ্যমের আদলে বানানো ফটোকার্ড। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম দেখায় এসব কনটেন্ট সত্য বলে মনে হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস ও শেয়ার করছেন ব্যবহারকারীরা। এতে ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ, আতঙ্ক ও অবিশ্বাস বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবিসি বাংলার লোগো ব্যবহার করে ছড়ানো একটি ফটোকার্ডে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নামে গণভোটে ‘না’ ভোট দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেখানো হয়। পরে ফ্যাক্ট-চেকে প্রমাণিত হয়, এটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং বিবিসি নিউজ বাংলার কোনো প্রকাশনা নয়। একইভাবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে মেট্রোরেল বন্ধ করে ‘ডিজিটাল লোকাল বাস’ চালুর দাবি করেছে—এমন একটি এআই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরেক ঘটনায় দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের একটি ভিডিওতে দেখানো হয়, তারা লাল টেলিফোনে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলছেন। বাস্তবে এটি ছিল জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও, যেখানে টেলিফোনটি প্রদর্শনীর অংশ ছিল। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিওটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এসব ডিপফেক কনটেন্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও বেসিসের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রাফেল কবির বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও বা অডিও সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। নীতিমালার অভাবে এ ধরনের অপপ্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতেও এআই-ভিত্তিক অপপ্রচারের নজির রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের কণ্ঠ নকল করে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানানো একটি ডিপফেক ফোনকল ভাইরাল হয়েছিল। ভারত, কানাডা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও নির্বাচনে এআইচালিত গুজব ছড়ানোর ঘটনা দেখা গেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন বিষয়টিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, এআই অপব্যবহার মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ অনলাইনে প্রচার চালালে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে।
এদিকে ভুয়া তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, পিআইবি, বাসস, বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এ সেল কাজ করছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, এআই নীতিমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত এবং নির্বাচনের আগেই অনুমোদনের আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনী পরিবেশ নিরাপদ রাখতে কেবল প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সংবেদনশীল তথ্য দেখলে যাচাই ছাড়া বিশ্বাস বা শেয়ার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।















