সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের চাচা এবং একসময়ের প্রভাবশালী সামরিক নেতা রিফাত আল আসাদ মারা গেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ঊননব্বই বছর।
রিফাত আল আসাদ ছিলেন সিরিয়ার কুখ্যাত সামরিক বাহিনী ‘ডিফেন্স কোম্পানি’র প্রধান। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েই তিনি উনিশশো বিরাশি সালে সিরিয়ার হামা শহরে ভয়াবহ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, যা ইতিহাসে হামা হত্যাযজ্ঞ নামে পরিচিত। এই অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন এবং পুরো শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এই ভূমিকার জন্য তাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘হামার কসাই’ নামে অভিহিত করা হতো।
উনিশশো সাতত্রিশ সালে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার কারদাহা শহরে জন্ম নেওয়া রিফাত আল আসাদ আলাউই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। সত্তরের দশকে আসাদ পরিবারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে আশির দশকের শুরুতে নিজের ভাই সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
হামা শহরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিদ্রোহ দমনের নামে রিফাতের নেতৃত্বে প্রায় চল্লিশ হাজার সেনা নিয়ে এক মাসব্যাপী অভিযান চালানো হয়। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ নিহত হন এবং সতেরো হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। বহু মসজিদ ও গির্জা ধ্বংস হয়। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব ঘটনার দায় অস্বীকার করে সব নির্দেশ ভাই হাফেজ আল আসাদের ছিল বলে দাবি করেন।
রিফাত আল আসাদ বাথ পার্টিতে যোগ দেন উনিশশো বায়ান্ন সালে এবং ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। উনিশশো সত্তরের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যার মাধ্যমে হাফেজ আল আসাদ ক্ষমতায় আসেন। পরে বিরোধীদের দমনে কঠোর পন্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠেন।
উনিশশো তিরাশি সালে হাফেজ আল আসাদ অসুস্থ থাকাকালে রিফাত ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। রাজধানী দামেস্কে নিজের অনুগত বাহিনী মোতায়েন করলেও শেষ পর্যন্ত এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরের বছর তাকে সামরিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির পদ দেওয়া হয় এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সে সময় লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে বিপুল অর্থ পাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এরপর প্রায় ছত্রিশ বছর তিনি ইউরোপে নির্বাসিত জীবন কাটান। এই সময়ে তার বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে একাধিক দেশে তদন্ত হয়। ফ্রান্সে দুই হাজার বিশ সালে অর্থপাচার ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের দায়ে তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। সুইজারল্যান্ডে হামা হত্যাযজ্ঞে ভূমিকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। যুক্তরাজ্য ও স্পেনেও তার পরিবারের সম্পদ জব্দ করা হয়।
কারাদণ্ড এড়াতে দুই হাজার একুশ সালে তিনি সিরিয়ায় ফিরে যান। যদিও এক দশক আগে তিনি প্রকাশ্যে বাশার আল আসাদের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন, পরে আবার প্যারিসে সিরীয় দূতাবাসে গিয়ে ভাতিজার পক্ষে ভোট দিতেও দেখা যায় তাকে।
দুই হাজার চব্বিশ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর তিনি সিরিয়া ছেড়ে দুবাইয়ে চলে যান। সেখানেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার মৃত্যু হয়।
রিফাত আল আসাদের মৃত্যু সিরিয়ার ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায়ের অবসান হলেও হামা হত্যাযজ্ঞের ক্ষত ও স্মৃতি এখনো বহু মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
















