বাংলাদেশে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলটির এই উত্থান দেশটির মধ্যপন্থী জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দলটি ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পরপরই নিজেদের পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। ওই সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে পড়লে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, যা কাজে লাগাতে চায় দলটি। দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং তুলনামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তারা ভোটারদের আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
গত ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দলটিকে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখানো হয় এবং বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনে তাদের সঙ্গে বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। দলের আমির শফিকুর রহমান বলেন, তারা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বদলে কল্যাণমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। চিকিৎসা শিবির, বন্যা ত্রাণ ও আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
দলটির শিকড় উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, যারা সমাজ পরিচালনায় ইসলামী নীতির পক্ষে ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় দলটি দীর্ঘদিন সমালোচিত ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দলটির শীর্ষ নেতাদের কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় ২০১৩ সালে দলটির নির্বাচন করার অধিকার বাতিল করা হয়, যা গত বছর পুনর্বহাল হয়।
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর দলটির ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে জয় পায়। পরে তারা জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, যা তাদের ভাবমূর্তি কিছুটা নরম করতে সহায়তা করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ঢাকার এক সাধারণ ব্যবসায়ী বলেন, পুরোনো দলগুলো থেকে মানুষ ক্লান্ত, নতুন কিছু চায় বলেই তারা এই দলটির দিকে ঝুঁকছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দমননীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই দলটির পুনরুত্থানে ভূমিকা রেখেছে।
প্রথমবারের মতো দলটি একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরোধিতা করেছে। দলটির দাবি, তারা ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়। নারী অধিকার নিয়েও আশ্বাস দেওয়া হলেও সরাসরি কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। নারীবাদী সংগঠনগুলোর মতে, এসব প্রতিশ্রুতি মূলত নির্বাচনী কৌশল।
শেখ হাসিনার বিদায়ের পর দেশে ইসলামী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হিন্দু ও সুফি উপাসনালয়ে হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নারী ফুটবল ম্যাচে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনায় শূন্য সহনশীলতার কথা বললেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় কাটেনি।
এক সংখ্যালঘু নেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তার আশঙ্কা, ইসলামী দল নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ আরও কট্টর ধর্মীয় রাষ্ট্রের দিকে যেতে পারে।
তবে দলটির মুখপাত্র এসব সহিংসতার দায় অস্বীকার করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অতীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শরিক থাকা দলটি এবার দেশের প্রায় সব ইসলামী দলের সঙ্গে জোট করেছে। তারা ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং ভোটার মনোভাব বুঝতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক এই পরিবর্তন বাংলাদেশকে ভিন্ন এক পথে নিতে পারে, যদিও দলটির নেতৃত্ব বলছে, তারা সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং কোনো একক রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকবে না।
















