কলসেন্টারের চাকরি থেকে কক্সবাজারে শৈবাল চাষ—সুপারফুডকে ঘিরে নতুন উদ্যোক্তা গল্প
সামুদ্রিক শৈবালকে শুধু খাবার নয়, সুপারফুড ও পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা মারিয়া রে। চাকরি ছেড়ে কক্সবাজারে শৈবাল চাষ শুরু করে ইতোমধ্যে তিনি এগোচ্ছেন বড় ব্যবসার পথে।
চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু হলেও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মারিয়া রে। ঢাকায় কলসেন্টারের চাকরি, বিপণন ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব, অনলাইন ক্লাউড কিচেন—সব অভিজ্ঞতার পর আজ তিনি কক্সবাজারে সামুদ্রিক শৈবাল চাষে নাম লিখিয়েছেন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে।
২০২২ সালে কক্সবাজারে ‘স্টারিনাস কিচেন’ নামে রেস্টুরেন্ট দিয়ে শুরু হয় মারিয়ার উদ্যোক্তা যাত্রা। পর্যটন মৌসুমে যেখানে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসা হতো, সেখানেই প্রথমবার সি উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে স্যুপ ও ফিউশন খাবার পরিবেশন শুরু করেন তিনি। পর্যটকদের ইতিবাচক সাড়া তাঁকে নতুন ভাবনায় উৎসাহ দেয়।
শৈবাল থেকে সাবান, আর সেখান থেকেই চাষের সিদ্ধান্ত
এরপর স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে শুকনা গুঁড়া ও সাবান তৈরি শুরু করেন মারিয়া। শুধু ২০২৫ সালেই এসব পণ্য বিক্রি করে আয় করেন প্রায় দুই লাখ টাকা। ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া এলাকায় নিজ উদ্যোগে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ শুরু করেন।
প্রায় দেড় একর জমিতে তিনি চাষ করছেন উলভা ও গ্র্যাসেলেরিয়া—এই দুই প্রজাতির শৈবাল। গ্র্যাসেলেরিয়া মূলত শীতকালে সমুদ্র উপকূলে পাওয়া যায়, সেখান থেকেই বীজ সংগ্রহ করা হয়। আর উলভা শৈবালের বীজ নেওয়া হয়েছে কক্সবাজার কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে।
এই চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ছয়টি জেলে পরিবারের নারী সদস্যরা—যা স্থানীয় নারীদের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
উৎপাদন ও ব্যবসার হিসাব
নভেম্বর থেকে এপ্রিল—এই সময়টাই শৈবাল চাষের মৌসুম। এক মাস পরপর শৈবাল সংগ্রহ করা যায়। চলতি মৌসুমে মারিয়ার লক্ষ্য প্রায় ২৪ টন উলভা শৈবাল উৎপাদন, যা থেকে তৈরি হবে প্রায় দুই টন শুকনা শৈবাল। পাশাপাশি উৎপাদিত হবে আরও ৫০০ কেজি গ্র্যাসেলেরিয়া শৈবাল।
সব মিলিয়ে চলতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকার শৈবাল ও শৈবালজাত পণ্য বিক্রির লক্ষ্য তাঁর। বর্তমানে তিনি অনলাইনে ‘সি ফরেস্ট বিডি’ নামে ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করছেন।
কেন সামুদ্রিক শৈবাল?
মারিয়া রে বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে রয়েছে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি–এজিং উপাদান, নানা ভিটামিন ও খনিজ—তাই একে বলা হয় সুপারফুড। এটি কাঁচা খাওয়া যায়, শুকিয়ে পাউডার বানিয়ে খাবার, প্রসাধনী ও ওষুধেও ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি জৈব সার ও পশুখাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার বাড়ছে। শিশু ও নারীদের আয়োডিন ও পুষ্টি ঘাটতি পূরণেও শৈবাল কার্যকর।
কলসেন্টার থেকে সমুদ্রপাড়ে
২০০৮ সালে ঢাকায় কলসেন্টারে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছিলেন মারিয়া। ব্যবসার আগ্রহে রাতের শিফট করে দিনে পারলার ও কাপড়ের ব্যবসাও চালাতেন। ২০১৮ সালে বিয়ের পর কক্সবাজারে বসবাস শুরু হয়। রান্নার প্রতি আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই—কারণ তাঁর বাবা ছিলেন একজন শেফ।
২০১৯ সালে অনলাইন ক্লাউড কিচেন চালু করেন, আর ২০২২ সালে লাবণী বিচে খোলেন রেস্টুরেন্ট। শাশুড়ির এক বন্ধুর মাধ্যমে বিদেশি শুকনা শৈবালের সঙ্গে পরিচয় থেকেই শুরু হয় সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা–নিরীক্ষা।
রাখাইন সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস থেকে শিখে তিনি দেখেন, গ্র্যাসেলেরিয়া ও উলভা শৈবাল বাঙালি খাবারেও সহজেই মানিয়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু শৈবালভিত্তিক ফিউশন খাবার।
বড় স্বপ্নের পথে
ব্যবসার পথচলায় ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আমরাই তারা’ উদ্যোগের আওতায় বিপণন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মারিয়া। তাঁর ভাষায়, এই প্রশিক্ষণ তাঁকে আরও বড়ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
চাকরি ছেড়ে সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে মারিয়া রে আজ শুধু শৈবাল চাষ করছেন না—তিনি দেখাচ্ছেন, নতুন ভাবনা আর সাহস থাকলে সুপারফুডও হতে পারে বড় ব্যবসার ভিত্তি।
















