শীতের তীব্রতায় সিলেট নগরের পরিত্যক্ত জলাশয়ে গড়ে উঠেছে পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়
শীতের সন্ধ্যায় সিলেট নগরের ঘাসিটুলা লামাপাড়া এলাকায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাতিসরালির উড়াল যেন প্রকৃতির এক নীরব উৎসব। পরিত্যক্ত জলাশয়ের কচুরিপানায় জড়ো হয়ে পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে উঠছে নগরের আকাশ-বাতাস।
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে পাতিসরালি। তাদের সঙ্গে আছে জলময়ূর, বক আর ডাহুকও। দিনভর ওড়াউড়ি শেষে সন্ধ্যা নামলেই কয়েক শ পাখি একসঙ্গে জড়ো হয় ঘাসিটুলা লামাপাড়া এলাকার প্রায় পরিত্যক্ত এক জলাশয়ের কচুরিপানার ওপর। সন্ধ্যার কুয়াশা আর শিশিরভেজা হাওয়ার মধ্যে পাখিদের এই সমাবেশ তৈরি করে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।
মাস দেড়েক ধরে শীতের পরিযায়ী পাখিরা এই জলাশয়কে অস্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে কিছু দেশি পাখিও। নগরের ব্যস্ততার মাঝেও এখানে যেন তৈরি হয়েছে এক নিরিবিলি প্রকৃতির কোণ।
কেন ঘাসিটুলা পুকুরেই পাখিদের আনাগোনা?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘাসিটুলা পঞ্চায়েতি কবরস্থান এলাকা তুলনামূলকভাবে নির্জন ও কোলাহলমুক্ত। আশপাশে গাছগাছালি রয়েছে, বাড়িঘরের ঘনত্বও কম। কবরস্থান ঘেঁষেই থাকা বড় পুকুরটিতে পানি কম হলেও কচুরিপানা ও ঘাসে ভরা জলাভূমি পাখিদের জন্য আদর্শ আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

পুকুরপাড়ের এক দোকানি শাহাদাত ইসলাম বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে এখানে ব্যবসা করছি। প্রতি শীতেই পাখি আসে। তবে এবার শীত বেশি পড়ায় পাখির সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ পাখি শিকার করে না—এটাই ওদের নিরাপত্তা।’
নগরের মানুষও মুগ্ধ
সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পাখিদের উড়াল দেখছিলেন অনেকেই। এক কিশোর বিস্ময়ভরা চোখে বাবার হাত ধরে পাখিদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বাবা মাহতাব আলী বলেন, ‘ব্যস্ত নগরের মাঝে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। স্থানীয় মানুষ পাখিদের বিরক্ত করছে না বলেই তারা এখানে নিশ্চিন্তে আছে।’
দর্শনার্থীদের ভাষ্য, সকাল-বিকেল-সন্ধ্যায় এখন অনেকে পাখি দেখতে আসছেন। বড় জলাশয় হওয়ায় মানুষের উপস্থিতিও পাখিদের খুব একটা বিরক্ত করছে না।
নিরাপত্তাই টেনে এনেছে পাখিদের
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, শীতকালে হাওরাঞ্চলে পাখিশিকার বাড়ে, ফলে পরিযায়ী পাখিরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। ‘ঘাসিটুলা এলাকায় এত পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে, তারা এখানে নিরাপদ বোধ করছে। আমাদের দায়িত্ব হলো—কোনোভাবেই যেন এই জায়গাটি তাদের কাছে অনিরাপদ না হয়ে ওঠে।’
শীতের নগরজীবনে ঘাসিটুলার এই পাখির কলরব যেন মনে করিয়ে দেয়—যেখানে নিরাপত্তা ও নির্জনতা আছে, সেখানেই প্রকৃতি আপন রূপে ধরা দেয়।
















