সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দোহাই দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিশুদের ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের যে ভয়াবহ জালিয়াতি চলেছিল, সরকারি তদন্তে তার পূর্ণ সত্যতা মিলেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জেলা প্রশাসনের তদন্তে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল ভুয়া নিবন্ধন অবিলম্বে শনাক্ত করে তা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান।
জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র ও তদন্ত প্রতিবেদন
গত ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ও বুধল, কসবার কুটি এবং আশুগঞ্জের চরচারতলা ইউনিয়নে ডেটাবেজে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহার করে শত শত ভুয়া জন্ম-মৃত্যু সনদ তৈরি করা হয়েছে। এমন অনেক শিশুর নিবন্ধন করা হয়েছে, যাদের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। সরকারি তদন্তে দেখা গেছে, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজেদের লক্ষ্যপূরণের (Target) চাপ সামলাতে এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
গত ৮ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরেজমিন তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন।
জেলা প্রশাসকের কঠোর হুঁশিয়ারি
গত ১১ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভায় জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন:
- শাস্তি দ্বিগুণ: ভুয়া নিবন্ধন শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের শিথিলতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করা হবে।
- লক্ষ্যমাত্রা নয়, প্রকৃত তথ্য: কর্মকর্তাদের লক্ষ্যপূরণের পেছনে না ছুটে কেবলমাত্র প্রকৃত জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- তদারকি: ২০২৫ সালের সকল ভুয়া নিবন্ধন শনাক্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বাতিলের প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য আট দফা নির্দেশনা
জালিয়াতি রোধে গত ১৩ জানুয়ারি আট দফা নির্দেশনা দিয়ে মাঠপর্যায়ে চিঠি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। নির্দেশনায় সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে ২০২৫ সালের প্রকৃত নবজাতকদের তালিকা সংগ্রহ করে দ্রুত নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠোরভাবে পরিবীক্ষণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবহারের পরেও কীভাবে এত বড় জালিয়াতি কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে গেল এবং এর পেছনে কেবল টার্গেট পূরণের চাপ নাকি অন্য কোনো আর্থিক লেনদেন জড়িত ছিল।
















