রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীপথে আবারও যাত্রীবাহী ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সেবা চালুর আগে নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং যাত্রী আকর্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব তথ্য জানান। ঢাকার চারপাশের নদীপথে যাত্রীবান্ধব নৌপরিবহন চালুর পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক ফলোআপ বৈঠক শেষে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নয়, পর্যটনবান্ধব জলপথ হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য এমন একটি রুট বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, যেখানে গাবতলী থেকে যাত্রা শুরু করে আশুলিয়া, টঙ্গি, নারায়ণগঞ্জ, সদরঘাট ও বসিলা ঘুরে আবার গাবতলীতে ফেরা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নদীদূষণ। সরকারি জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টি এবং ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি পয়েন্ট থেকে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পকারখানার প্রায় ১৫০টি পয়েন্ট থেকেও দূষিত বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ৪২৪টি স্থানে সরাসরি বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এসব দূষণের উৎস বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পরিকল্পনা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, নদীর বর্তমান পরিবেশ অনেক স্থানে দুর্গন্ধ ও আবর্জনায় ভরা থাকায় মানুষ নৌপথে ভ্রমণে আগ্রহ হারায়। নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ উন্নত করা গেলে যাতায়াতের পাশাপাশি বিনোদনের জন্যও মানুষ ওয়াটার বাস ব্যবহার করবে বলে সরকার আশা করছে।
নাব্যতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কয়েকটি স্থানে নাব্যতা সংকট দেখা দিলেও বর্ষাকালে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকে। অতীতে যমুনা থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও বালু নদীতে প্রবাহ ধরে রাখার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আপাতত বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যেই সেবা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ওয়াটার বাস পরিচালনা করলেও গত ১০ বছরে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে এবার কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ সেবা পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে এবং তাদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
লোকসানের কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, আগে পর্যাপ্তসংখ্যক ওয়াটার বাস না থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। একই গন্তব্যে সড়কপথে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে পৌঁছানো গেলেও নদীপথে সময় লাগত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। ফলে যাত্রীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। তবে নির্দিষ্ট বিরতিতে পর্যাপ্তসংখ্যক ওয়াটার বাস পরিচালনা করা গেলে যাত্রীসংখ্যা বাড়তে পারে, যদিও এতে পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, হাতিরঝিলে ওয়াটার বাস সফল হলেও সেখানে দূরত্ব কম, যাত্রীর চাপ বেশি এবং চলাচলে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। কিন্তু ঢাকার চারপাশের দীর্ঘ নদীপথে একই মডেল কার্যকর হবে না। তাই যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নদীপথে চলাচলের ক্ষেত্রে কয়েকটি সেতুও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গির রেলসেতুর নিচ দিয়ে ওয়াটার বাস চলাচলের পর্যাপ্ত উচ্চতা নেই। সড়ক সেতুর উচ্চতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও রেলসেতু উঁচু করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে ওই এলাকায় যাত্রীদের এক পাশ থেকে নেমে সেতু পার হয়ে অপর পাশে অপেক্ষমাণ ওয়াটার বাসে ওঠার বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, প্রকল্পটির জন্য এখনো আলাদা কোনো বাজেট নির্ধারণ করা হয়নি। আপাতত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ দায়িত্বের আওতায় প্রয়োজনীয় কাজ করবে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন দপ্তরকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনায় আবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তখন বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীবান্ধব নৌপরিবহন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য, প্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত মোকাবিলা করে ঢাকার চারপাশের নদীপথে আধুনিক ও আকর্ষণীয় ওয়াটার বাস সেবা চালু করা।
















