দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় আটক ইসরায়েলি নাগরিকদের মুক্তি দিয়েছে হামাস। একইসঙ্গে ইসরায়েলও প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই বিনিময় কার্যক্রম চলছে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার সকালে ইসরায়েলে আনন্দের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে, যখন স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জানায়, প্রথম ধাপে সাতজন বন্দিকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের (আইসিআরসি) হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে, আরও ১৩ জনকে হস্তান্তর করা হয়েছে, যাদের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থিত ওফের সামরিক কারাগারের বাইরে কয়েকটি বাস দেখা গেছে, যেগুলোতে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের পরিবহন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সব জীবিত বন্দি ইসরায়েলে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেওয়া হবে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, প্রথম দফায় মুক্তি পাওয়া বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন গাই গিলবোয়া দালাল (২৪), আইতান মোর (২৫), মাতান আংগ্রেস্ট (২২), আলন ওহেল (২৪), গালি ও জিভ বারমান (দুজনের বয়স ২৮) এবং ওমরি মিরান (৪৮)। মুক্তিপ্রাপ্তরা পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
জর্ডানের আম্মান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নূর ওদেহ জানিয়েছেন, মুক্তিপ্রাপ্তদের শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো, তারা চিকিৎসা ছাড়াই হাঁটতে পারছেন। ওহেলের পরিবার ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-কে জানিয়েছে, তাদের ছেলে ‘দারুণভাবে দাঁড়িয়ে আছে’, আর মোরের মা জানিয়েছেন, তার ছেলে ‘ভালো আছে, যদিও কিছুটা ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে’।
নেতানিয়াহুর মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সোমবার সকাল ৯টা (জিএমটি) এর মধ্যেই সব জীবিত বন্দি মুক্তি দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এখনই নিহত ২৮ বন্দির দেহ ফেরত আসবে না বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
যুদ্ধবিরতির এই পদক্ষেপ গাজায় চলমান ভয়াবহ মানবিক সংকট প্রশমনের আশা জাগিয়েছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৭ হাজার ৮০৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির ফলে গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানো সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে ২৩ লাখ মানুষের অধিকাংশই দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে।
এদিকে, বন্দি বিনিময়ের মাঝেই ট্রাম্প ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাকে স্বাগত জানান। সোমবার তিনি ইসরায়েলি সংসদ কনেসেটে ভাষণ দেওয়ার পর মিশরে গাজা যুদ্ধবিরতি বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেবেন।
ইসরায়েলে যাওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে।”
গাজার খান ইউনিসে আল জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি জানিয়েছেন, নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে মুক্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালের বাইরে প্রিয়জনদের স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছেন।
২৩ বছর বয়সী মুক্তিপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আবু আজজুমের বাবা ইয়াসের আবু আজজুম বলেন, “এই অনুভূতি বর্ণনাতীত। আনন্দে আমি ঠিকভাবে কথা বলতে পারছি না।”

















