নাগরিকের আয়নায় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আয়নায় নাগরিক; সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট আর অগণতান্ত্রিক চর্চায় কি পথ হারাচ্ছে বাংলাদেশ?
উন্নত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত একটি আদর্শ পরিবারের মতো সাম্য ও দরদ। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভাব, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য এবং ক্রমাগত অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রকে একটি কাঙ্ক্ষিত রূপ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। লেখক আলমগীর খানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও নাগরিক চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা।
রাষ্ট্র যখন ধর্ম, ভাষা, জাতি বা সম্পদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে চলে, তখন তা একটি আদর্শ পরিবার হতে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ‘জঙ্গলের যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় একটি উন্নত রাষ্ট্রকে হতে হয় পরিবারের মতো জনকল্যাণমুখী ও দরদী। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এসেও আমাদের রাষ্ট্র সেই কাঙ্ক্ষিত রূপ থেকে কতটা দূরে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
একটি প্রচলিত ধারণা আছে—পরিবার দেখে যেমন সদস্যকে চেনা যায়, তেমনি নাগরিকদের আচরণ দেখে রাষ্ট্রকে চেনা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি মাঝেমধ্যে যে অবিশ্বাসের ছবি ফুটে ওঠে, তার মূলে রয়েছে নিজ দেশে প্রতিনিয়ত হেনস্থার শিকার হওয়ার সংস্কৃতি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পণ্য রপ্তানি বা বিদেশি বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো কেবল অর্থনীতির ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে।
রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজটা পরিবারের মতো সহজ নয়। ক্ষমতার জোরে কাউকে ‘রাষ্ট্রপিতা’ বা ‘রাষ্ট্র মাতা’ উপাধিতে ভূষিত করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। মানুষের মনের ভেতর সেই সম্মান যদি আপনি থেকে গড়ে ওঠে, তবেই তা প্রকৃত অর্জন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের সব কিছু মুছে ফেলার সংস্কৃতি।
সাংবাদিক আমীন আল রশীদের গবেষণা উদ্ধৃত করে বলা যায়, বাংলাদেশের যাত্রাপথে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের দেখা মিলেছে মাত্র ১৫ বছরের মতো। বাকি সময়টা কেটেছে একদলীয় শাসন কিংবা ‘বন্দুকের শাসনে’। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অন্য মত বা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতাই ছিল প্রবল।
একটি পরিবারের সৌন্দর্য হলো এর দুর্বলতম সদস্যের স্বার্থ আগে দেখা। অথচ আমাদের রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের অহমিকা অনেক সময় সংখ্যালঘুর অধিকারকে লীন করে দেয়। একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল পারমাণবিক অস্ত্রে নয়, বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে।
আগামীর পথ: বিভক্তি নাকি ঐক্য? দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারী শাসনের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব তৈরি হয়। এক স্বৈরাচারের পতনের পর আরেক স্বৈরাচারের উত্থান প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণমূলক রাজনীতি। নির্বাচনের জয়লাভ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে হতে পারে, কিন্তু শাসনের সার্থকতা নির্ভর করে যারা বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর।
একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে বিভক্তির রাজনীতি ছেড়ে ঐক্যের বোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।















