যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা চাঁদে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সোমবার। স্পেসএক্সের বিশাল রকেট ‘স্টারশিপ’-এর পরবর্তী পরীক্ষা উৎক্ষেপণ হবে টেক্সাসের স্টারবেস থেকে, যা অনেকের কাছে নাসার চাঁদ অভিযানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নাসা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে চাঁদে মানব অবতরণ মিশন ‘আর্টেমিস–৩’ পরিচালনা করতে চায়। এই অভিযানে মূল ভূমিকা নেবে স্পেসএক্সের স্টারশিপ, যা এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় রকেট ব্যবস্থা। কিন্তু এই রকেটের কার্যকারিতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, চীনের মহাকাশ সংস্থা দ্রুত এগিয়ে আসছে।
‘চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই চাঁদে হাঁটবে—এটা প্রায় নিশ্চিত,’ সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন বিজ্ঞান প্রচারক ও ‘দ্য প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র প্রধান বিল নাই। তিনি বলেন, ‘এটি মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো সময়।’
স্টারশিপ এখনো প্রাথমিক পরীক্ষার ধাপে আছে। এর ১০টি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের মধ্যে ছয়টি আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি একটি প্রোটোটাইপ স্থল পরীক্ষার সময় বিস্ফোরিত হয়। সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে (ইটি) ১১তম উড্ডয়ন পরীক্ষা নির্ধারিত আছে।
এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থানকালে কীভাবে রকেটটি পুনরায় জ্বালানি ভরবে, যা এর বিশাল আকৃতির কারণে একেবারেই নতুন প্রযুক্তি। নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের প্রকৌশলীরা অনুমান করছেন, একটি চাঁদ অবতরণের জন্য স্টারশিপকে হয়তো ৪০টিরও বেশি ফুয়েল ট্যাঙ্কার উৎক্ষেপণ করতে হবে, যদিও স্পেসএক্স পূর্বে জানিয়েছিল সংখ্যাটি ১০টির মতো হতে পারে।
নাসার সাবেক প্রশাসক জিম ব্রাইডেনস্টাইন এই পরিকল্পনাকে ‘অত্যন্ত জটিল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এমন জটিল নকশা কোনো নাসা প্রশাসক স্বেচ্ছায় বেছে নিতেন না।’
অন্যদিকে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক শন ডাফি এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা হাল ছাড়ছি না। আমরা চীনকে আগে চাঁদে পৌঁছাতে দেব না।’
আর্টেমিস–৩ মিশন আগের অ্যাপোলো অভিযানের মতো সহজ নয়। তখন একটি স্যাটার্ন–ভি রকেটেই নভোচারী, অবতরণযান এবং সরঞ্জাম একসঙ্গে পাঠানো হতো। কিন্তু এবার নাসা একাধিক ধাপের জটিল কাঠামো বেছে নিয়েছে।
প্রথমে একটি স্টারশিপ রকেট জ্বালানি ডিপো হিসেবে কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। এরপর আরও কয়েকটি স্টারশিপ ট্যাঙ্কার রকেট উৎক্ষেপণ করে এতে জ্বালানি ভরা হবে। তারপর মানুষ বহনের উপযোগী স্টারশিপ ‘এইচএলএস’ চাঁদের উদ্দেশ্যে যাবে। একই সময়ে নাসার নিজস্ব রকেট সিস্টেম এসএলএস থেকে ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান নভোচারীদের নিয়ে কক্ষপথে পৌঁছাবে। পরে ওরিয়ন চাঁদের কক্ষপথে স্টারশিপের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে দুই নভোচারীকে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামাবে।
এই মেরু অঞ্চলটি দুর্গম ও বিপজ্জনক, তবে এখানেই বরফ আকারে পানি থাকার সম্ভাবনা বেশি। নাসা এই অঞ্চলেই ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এত জটিল ও ব্যয়বহুল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে এবং চীন হয়তো এর আগেই চাঁদে পৌঁছাবে। স্পেস নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডগ লাভেরো বলেন, ‘এটি এক অত্যন্ত জটিল প্রকল্প, যা বাস্তবায়নে নাসার এক দশক লেগে যেতে পারে।’
স্পেসএক্সের এই প্রকল্পটি ২.৯ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে নির্বাচিত হয় ২০২১ সালে, যখন নাসার কোনো স্থায়ী প্রশাসক নিযুক্ত ছিল না। পরবর্তীতে ব্লু অরিজিন কোম্পানি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করলেও আদালত নাসার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
নাসা বর্তমানে দুই কোম্পানিকেই ব্যবহার করছে, তবে স্টারশিপই প্রথম মানব অবতরণ প্রকল্পের মূল অংশ।
কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, সময় ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই প্রকল্পে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। নাসার অ্যারোস্পেস সেফটি অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য পল হিল সম্প্রতি জানান, স্টারশিপের সময়সূচি ‘বেশ চ্যালেঞ্জিং’ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে হিল বলেন, স্পেসএক্সের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও পূর্ববর্তী সফলতাগুলো আশাব্যঞ্জক। ‘স্পেসএক্সের মতো উদ্যম ও সৃজনশীলতা অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থায় দেখা যায় না,’ তিনি মন্তব্য করেন।

















