১৩ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা শুধু দেশের অর্থনীতির রক্তধারা নয়—তাঁরা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের মর্যাদার প্রতীকও। চাঁদপুরের জহিরুল ইসলাম বা নরসিংদীর আরিফ মিয়ার গল্পগুলো ব্যক্তিগত সফলতার উদাহরণ হলেও, এর ভেতর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের দক্ষ অভিবাসন সংকট, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ এবং ভূ-রাজনৈতিক শ্রমবাজার প্রতিযোগিতার বাস্তবতা।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে প্রায় ২১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। এই রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে।
তবে, এই সাফল্যের মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিদ্যমান: বাংলাদেশ কি কেবল অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই পরিচিত থাকবে, নাকি দক্ষ শ্রমের কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে?
দক্ষতার নতুন মানচিত্র
২০২৫ সালে বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখন ওয়েল্ডার, কেয়ারগিভার, নার্সিং, নির্মাণ সুপারভাইজার ও ডিজিটাল টেকনিশিয়ান পেশায় দক্ষ কর্মী চায়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন একটি সামঞ্জস্যহীন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে একদিকে ১ কোটিরও বেশি প্রবাসী কর্মী দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে, অন্যদিকে মাত্র ৪% শ্রমিক পেশাদার বা উচ্চদক্ষ শ্রেণিতে পড়ছে।
নীতিগত সীমাবদ্ধতা: দক্ষতা ও বাস্তবতার ফাঁক রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, “বাংলাদেশ এখনো মূলত অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিক প্রেরণের বাজারে আটকে আছে।”
বিএমইটির অধীনে ১১০টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) থাকলেও, অর্ধেকের বেশি কেন্দ্র দক্ষ প্রশিক্ষক সংকটে ভুগছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সার্টিফিকেশন না থাকায় বিদেশে এই প্রশিক্ষণের মূল্য প্রায় শূন্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন,
এটি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং “দক্ষতা কূটনীতির অভাব”।
যে দেশে শ্রমশক্তির ৫০% অদক্ষ, সেখানে দক্ষতা রপ্তানি নীতি না থাকলে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল থাকবে।
শ্রমবাজারে নতুন প্রতিযোগিতা
মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ—এই তিনটি অঞ্চল এখন শ্রম আমদানির ভূরাজনৈতিক অক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারত, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই তাদের নাগরিকদের জন্য দক্ষতা-নির্ভর রপ্তানি প্রোগ্রাম চালু করেছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ এখন কৌশলগতভাবে “শ্রম রপ্তানির তৃতীয় সারিতে” ঠেকছে।
চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” প্রকল্পে যেখানে ভিয়েতনামি ও ইন্দোনেশীয় শ্রমিকরা কাজ করছে দক্ষতার ভিত্তিতে, বাংলাদেশ সেখানে অধিকাংশ সময় সাবকন্ট্রাক্ট লেবার হিসেবে অংশ নিচ্ছে। এই অবস্থাকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন “মানবসম্পদ কূটনীতির ঘাটতি”।
প্রবাসী থেকে উদ্যোক্তা
প্রবাস থেকে ফিরে আসা জহিরুল, আরিফ কিংবা আবুল কালাম—তাঁদের গল্পে একটা সাধারণ সূত্র আছে:
বিদেশে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
জহিরুল এখন মাছ ও পশুপালন খামার পরিচালনা করছেন, আরিফ গড়ে তুলেছেন “দেব এগ্রো লিমিটেড”, আর আবুল কালামের উদ্যোগে ২০ জন মানুষ কর্মসংস্থান পেয়েছে।
এই সাফল্যগুলো দেখাচ্ছে, দক্ষতা কেবল রেমিট্যান্স বাড়ায় না; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটায়।
কৌশলগত সুপারিশ
- দক্ষতা-কূটনীতি প্রতিষ্ঠা: প্রধান শ্রমবাজার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ: টিটিসি-তে প্রশিক্ষণকে ISO ও ILO মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা জরুরি।
- ডিজিটাল রেমিট্যান্স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার: অর্থনৈতিক নীতি পরিকল্পনায় নারী ও ডিজিটাল চ্যানেলের অংশ নিশ্চিত করা।
- ফেরত অভিবাসীদের পুনঃএকীকরণ নীতি: বিদেশফেরতদের জন্য উদ্যোক্তা ঋণ, কর ছাড় ও প্রশিক্ষণ সংযুক্ত প্রণোদনা প্রবর্তন।
প্রবাস নয়, এটি উন্নয়নের কৌশল
বাংলাদেশের অভিবাসন এখন শুধুমাত্র শ্রম রপ্তানি নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল।
দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই প্রবাসী আন্দোলনকে “জাতীয় মানবসম্পদ পুনর্গঠনের অংশ” হিসেবে দেখা দরকার।
একজন বিশেষজ্ঞের ভাষায়,
“প্রবাসী শ্রমিক কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক নয়, তিনি রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত—যিনি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি, কর্মসংস্কৃতি ও সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটান।”
বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের অভিবাসীরা হয়তো কেবল শ্রমিক নয়, বরং বিশ্ববাজারে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—
যদি আজই শুরু হয় কৌশলগত দক্ষতা উন্নয়নের বিপ্লব।
“বিদেশে দক্ষতা, দেশে প্রগতি” তখন আর শুধু স্লোগান থাকবে না—
এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের মানবসম্পদ কূটনীতির নতুন অধ্যায়।
















