২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি কক্সবাজারেই তাদের বেশিরভাগ বসবাস করছে।
এই শিবিরগুলোতে জীবন অত্যন্ত কঠিন। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পানি ও স্যানিটেশন এবং আশ্রয়ের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে তারা আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে জীবিকার সুযোগ খুবই সীমিত। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে।
মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশও থামেনি। ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আনুমানিক দেড় লাখ নতুন শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তহবিল সংকটের কারণে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, কীভাবে সীমিত সম্পদ দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দেওয়া যায়।
কক্সবাজারে বসবাসরত অনেক রোহিঙ্গা বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন। ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা শরণার্থী ফাতেমা জানান, আগে বৃষ্টির সময় তার ঘর ভিজে যেত এবং অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ত। ২০২৫ সালে নতুন একটি আশ্রয়ে স্থানান্তরের পর তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। নতুন আশ্রয়টি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পানি ব্যবস্থার কাছাকাছি হওয়ায় তার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায়ও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ইউএনএইচসিআর ও স্থানীয় অংশীদারদের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা কমিউনিটি কাউন্সেলররা শিবির পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে রোগীদের ক্লিনিকে পাঠানোর কাজ করছেন। তবে তহবিল কমে যাওয়ায় বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে চিকিৎসাসেবা সীমিত হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, কিছু রোহিঙ্গা নারী সীমিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। কক্সবাজারের একটি ইউএনএইচসিআর-সমর্থিত কারখানায় তারা পাট দিয়ে ব্যাগ তৈরি করছেন। এতে তারা নতুন দক্ষতা শিখছেন এবং সামান্য হলেও আয় করছেন। কারখানায় কর্মরত অধিকাংশ নারীই একক মা বা পরিবারপ্রধান, যাদের জন্য এই কাজ জীবিকার পাশাপাশি সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি করছে।
নতুন করে আসা শরণার্থীদের দুর্দশা আরও গভীর। মুহাম্মদ নামে এক শরণার্থী জানান, ২০২৫ সালে মিয়ানমারে তার ২১ বছর বয়সী ছেলেকে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী অপহরণ করে। ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে এবং সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। নতুন আগতদের জন্য আশ্রয়ের সংকট তীব্র, আর তহবিল ঘাটতির কারণে সহায়তা ক্রমেই সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
ইউএনএইচসিআর ও তার অংশীদাররা বাংলাদেশ সরকার ও স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে কাজ করে শরণার্থীদের সুরক্ষা ও সহায়তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। তবে মানবিক তহবিল কমে যাওয়ায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো প্রয়োজনীয় সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অনিশ্চয়তা ও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা তাদের বেঁচে থাকার জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
















