বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অংশীজনের মতামত ছাড়াই আইন চূড়ান্ত করা গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য বিপজ্জনক সংকেত
১৩ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশে সদ্য অনুমোদিত ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ নিয়ে নাগরিক সমাজ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই প্রক্রিয়াকে “অন্তর্ভুক্তিমূলক পরামর্শ ছাড়াই নেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত” বলে আখ্যা দিয়েছে এবং দুটি অধ্যাদেশ স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
ডিজিটাল সুরক্ষা নাকি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ?
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনুমোদিত খসড়াগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডেটা প্রোটেকশন প্রিন্সিপলস—যেমন স্বচ্ছতা, উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধতা ও জবাবদিহিতা—উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, “এটি তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো নয়, বরং সরকারি নজরদারির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ডিজিটাল অধিকার বিশ্লেষক রুবাইয়াত ফেরদৌস বলেছেন,
“বিচারবিভাগীয় তদারকি ছাড়া রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যক্তিগত ডেটায় অবারিত প্রবেশাধিকার দেওয়া গোপনীয়তার সংবিধানিক অধিকারের বিরোধী।”
প্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শারমিন রশিদ মনে করেন,
“সরকারই যখন সবচেয়ে বড় ডেটা নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়, তখন আইনের মূল লক্ষ্য — নাগরিক সুরক্ষা — নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।”
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বের অন্যত্র যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR বা ভারতের নতুন ডেটা আইন নাগরিক সম্মতি ও স্বচ্ছ তদারকির উপর জোর দিচ্ছে, বাংলাদেশ সেখানে উল্টো পথে হাঁটছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ঢাকায় এক পশ্চিমা কূটনীতিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেছেন,
“ডেটা সুরক্ষার নামে নজরদারি চালানো হলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাতে পারে।”
আইটি খাতের সংগঠন বেসিস হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বিদেশি ক্লায়েন্টরা ডেটা শেয়ারিংয়ে বাধা দেখলে বিলিয়ন ডলারের আউটসোর্সিং বাজার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক মাত্রা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই দ্রুত আইন চূড়ান্ত করার ঘটনাটি এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সুশাসন বিশ্লেষক মাহবুব রেজা বলছেন,
“অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের দাবি তোলার পাশাপাশি যদি সরকার গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়ে আইন পাস করে, তা রাজনৈতিক আস্থার ক্ষয় ডেকে আনবে।”
- সম্ভাব্য পরিণতি অর্থনীতি: ডেটা নিয়ন্ত্রণে অনিশ্চয়তা আউটসোর্সিং ও ফিনটেক খাতে বিনিয়োগ হ্রাস করতে পারে।
- মানবাধিকার: নজরদারির ঝুঁকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যম নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
- প্রযুক্তি: একক ‘ইন্টার-অপারেবিলিটি অথরিটি’ তৈরি করলে সাইবার নিরাপত্তায় নতুন দুর্বলতা সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর যেখানে একটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিহ্ন, সেখানে এই আইন তা-ই পরিণত করতে পারে রাজনৈতিক নজরদারির অস্ত্রে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষায়,
“যে আইন গোপনীয়তা রক্ষা করার কথা, সেটি যদি গোপনীয়তাকেই আঘাত করে, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী।”
















