দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও ‘বিয়ের মাধ্যমে সমঝোতা’ বন্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন; ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পর অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে দিয়ে মামলা নিষ্পত্তির প্রথা বন্ধে করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিচারপতি ফাতেমা নাজিব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ‘উত্থাপিত হয়নি’ (Not pressed) মর্মে আবেদনটি খারিজ করেন। রিটকারীর আইনজীবী জানান, বিবাদী নির্বাচনে কৌশলগত ত্রুটির কারণে এটি খারিজ হলেও অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে পুনরায় আবেদনটি পেশ করা হবে। মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা মনে করছেন, বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণের দায়মুক্তি দেওয়ার এই চর্চা দেশে যৌন সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে।
গত বছরের ২২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. রাকিবুল হাসান জনস্বার্থে এই রিটটি দায়ের করেছিলেন। তাঁর মতে, ধর্ষকের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং অপরাধীদের বিচার এড়ানোর পথ তৈরি করে দেয়।
কেন খারিজ হলো রিট?
শুনানি শেষে রিট আবেদনকারী আইনজীবী মো. রাকিবুল হাসান জানান, রিটে আইন সচিবের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র সচিবকে এক নম্বর বিবাদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই কারিগরি ত্রুটির কারণে আদালত বর্তমানে এটি গ্রহণ করেননি। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, “আবেদনটি সংশোধন করে খুব শিগগিরই পুনরায় বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে। কারণ এটি সরাসরি জনস্বার্থ ও নারীর মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত।”
রিটের মূল যুক্তি ও ‘দায়ীমুক্তির সংস্কৃতি’
আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ধর্ষক জামিন পেতে বা শাস্তি এড়াতে কারাগারেই বিয়ের আয়োজন করে। রিটে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছে: ১. সহিংসতাকে বৈধতা: বিয়ের মাধ্যমে সমঝোতা করার এই প্রথা পরোক্ষভাবে যৌন সহিংসতাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়। ২. আইনের অপব্যবহার: অভিযুক্তরা আদালতের অনুমতি নিয়ে কারাগারের ফটকে বিয়ে করে মূলত বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ৩. নোবেলের উদাহরণ: রিটে গায়ক মাইনুল আহসান নোবেলের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যাঁর বিরুদ্ধে করা ধর্ষণ মামলার বাদীর সঙ্গে কারাগারেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। মামলাটি এখনো বিচারাধীন থাকলেও বিয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তকে রক্ষার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিবাদী হিসেবে যাদের রাখা হয়েছে
এই রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কারা মহাপরিদর্শককে বিবাদী করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিয়ে প্রকৃতপক্ষে ভুক্তভোগী নারীর ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগের শামিল। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে ভুক্তভোগীকে ধর্ষকের সাথে ঘর করতে বাধ্য করা হয়, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। উচ্চ আদালত এই রিটের বিষয়ে চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত দেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।















