১২ জানুয়ারি ২০২৬: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপসহ একাধিক ‘খুব শক্ত বিকল্প’ বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সামরিক বাহিনীও বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছে।
ট্রাম্প জানান, ইরানের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, আমরা বিষয়টি খুব সিরিয়াসলি দেখছি। সামরিক বাহিনী বিষয়টি দেখছে এবং আমরা কিছু শক্ত বিকল্প নিয়ে ভাবছি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পর ইরানের নেতৃত্ব আলোচনার আগ্রহ দেখিয়ে যোগাযোগ করেছে এবং একটি বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈঠকের আগেই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে ইরানের শীর্ষ নেতারা বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ইরানে হামলা হলে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় গত ২৮ ডিসেম্বর, যখন তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের দরপতনের প্রতিবাদে দোকান বন্ধ করেন। পরে এই আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও ধীরে ধীরে তা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রূপ নেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিদেশভিত্তিক বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এর মধ্যে বহু বিক্ষোভকারী রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশজুড়ে টানা তিন দিনের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে।
রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের কথা শুনতে প্রস্তুত, তবে তিনি ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসী উপাদান’দের সহিংসতা থেকে বিরত রাখতে জনগণকে সতর্ক করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের অস্থিরতার পেছনে রয়েছে এবং অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে অশান্তি উসকে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির কথাও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে এবং গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান নিয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে ট্রাম্প মঙ্গলবার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, আলোচনায় সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সরকারবিরোধী শক্তিকে অনলাইনে সহায়তার মতো বিকল্প থাকতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের বিষয়ে তিনি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন। স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন। তিনি নিশ্চিত করেন, ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর সঙ্গে তাঁর শিগগিরই বৈঠক হবে এবং ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিক তেল কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প আবারও বলেন, এটি কেনা বা অন্য উপায়ে অধিগ্রহণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাঁর দাবি, রাশিয়া ও চীন সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, সহজ পথ হলো চুক্তি করা, তবে একভাবে না একভাবে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড অর্জন করবেই।
















