পেশাদার প্রকাশনা থেকে রাজনৈতিক মুখপত্রে রূপ, প্রশ্নে পুলিশের নিরপেক্ষতা
বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল মাসিক প্রকাশনা ‘ডিটেকটিভ’ দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে মুজিব পরিবারকে কেন্দ্র করে অতিভক্তিমূলক বন্দনার মঞ্চে পরিণত হয়; অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই বন্দনাই অনেক কর্মকর্তার দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার অলিখিত যোগ্যতা হয়ে উঠেছিল।
বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল মাসিক প্রকাশনা ‘ডিটেকটিভ’ (The Detective) একসময় অপরাধ বিশ্লেষণ ও পেশাদার গবেষণার প্ল্যাটফর্ম হলেও আওয়ামী শাসনের দীর্ঘ সময়ে তা রূপ নেয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের—বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও শেখ রাসেল—বন্দনার প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকাশনায় অতিমাত্রায় প্রশস্তিমূলক লেখা প্রকাশ করা অনেক কর্মকর্তার পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের কার্যকর পথ হয়ে উঠেছিল।
পুলিশের ভেতরে তখন রসিকতা চালু ছিল—“ডিটেকটিভে লেখা মানেই সিভিতে প্লাস পয়েন্ট” এবং “একটি কবিতা মানে একটি পদোন্নতি।” ২০১০ সালের পর প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় মুজিব পরিবারকেন্দ্রিক থিম নির্ধারিত হতো; সম্পাদকীয় নির্দেশনায়ও সেই বন্দনাই মূল কনটেন্টে রূপ নিত। ফলত পেশাদার গবেষণা, ফরেনসিক বা তদন্ততত্ত্বের বদলে জায়গা নেয় কবিতা, স্মৃতিকথা ও আবেগঘন প্রশস্তি
বিভিন্ন সংখ্যায় শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে পৌরাণিক/ঐশী মাত্রায় উন্নীত করে লেখা ছাপা হয়—‘অবিনশ্বর’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘বিশ্বমানবের জ্যোতি’ ইত্যাদি ভাষায়। পুলিশ সুপার, ডিআইজি ও র্যাব কর্মকর্তারাও এতে সরাসরি অংশ নেন। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক শপথ গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় বলে বিশ্লেষকদের মত।
ডিটেকটিভের পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মকর্তা পরে দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হন—আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার বা গ্রেড–১ পদমর্যাদায়। পুলিশের ভেতরে এদের ‘তেলবাজ কর্মকর্তা’ বলে ডাকা হতো। সরকার পরিবর্তনের পর তাদের অনেকেরই অবনমন, মামলা বা বিদেশে পালানোর ঘটনা তোষণভিত্তিক ক্যারিয়ারের ভঙ্গুরতা তুলে ধরেছে।
সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু পুলিশের মুখপত্রে এমন ভাষা প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে—যারা এই বন্দনায় সক্রিয় থেকে সুফল পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা হবে কি না।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, বাহিনীর প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রমে রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা জোরদার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
















