কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের চেষ্টাকালে গত আড়াই মাসে নারী-শিশুসহ ৪৪৭ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্যাম্পভিত্তিক দালাল ও স্থানীয় পাচারকারীদের সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এই মরণফাঁদ বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পগুলো থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের অপচেষ্টা কোনোভাবেই থামছে না। গত আড়াই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের তৎপরতায় পাচারের শিকার হতে যাওয়া ৪৪৭ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। সবশেষ গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর অভিযানে ২৭৩ জনকে উদ্ধারের ঘটনাটি এই সংকটের গভীরতাকে আবারও সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পভিত্তিক সক্রিয় দালালচক্র এবং সমুদ্র উপকূলের বাংলাদেশি মানবপাচারকারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় রোহিঙ্গাদের এই মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উপকূল ও গভীর সমুদ্রে দফায় দফায় উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। ৪ জানুয়ারি নৌবাহিনীর অভিযানে ২৭৩ জন ছাড়াও ২৮ ডিসেম্বর বিজিবি ১৮ জনকে, ২৫ নভেম্বর কোস্টগার্ড ২৮ জন এবং ২৯ অক্টোবর পৃথক অভিযানে র্যাব ও কোস্টগার্ড ৫৪ জনকে উদ্ধার করে। টেকনাফের বাহারছড়া গহীন পাহাড়, মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন উপকূল এবং সেন্টমার্টিনের অদূরে গভীর সমুদ্র থেকে এসব পাচার ভিকটিমদের উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু, যা পাচারকারীদের বিশেষ টার্গেট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাচারকারী চক্রের মূল টার্গেটে থাকে ক্যাম্পের তরুণী ও কম বয়সী বিধবা নারীরা। অবিবাহিত নারীদের মালয়েশিয়ায় থাকা সচ্ছল যুবকদের সঙ্গে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং গৃহবধূদের সেখানে অবস্থানরত স্বামীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দালালরা প্রলুব্ধ করে। অন্যদিকে, বেকার যুবকদের বিদেশের মাটিতে উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্যাম্পভিত্তিক রোহিঙ্গা দালালরা ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ‘টোকেন মানি’ হিসেবে নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি দালালদের হাতে তুলে দেয়। এরপর তাদের গোপন আস্তানা থেকে ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে উঠানোর চেষ্টা চলে। অনেক সময় দালালরা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে মাঝসমুদ্রে কয়েকদিন ঘুরিয়ে ‘মালয়েশিয়া পৌঁছে গেছে’ বলে টেকনাফের সোনাদিয়া বা শাহপরীর দ্বীপের চরে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস দাবি করেছেন, সাগরপথে অবৈধভাবে পাচার রোধে পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক গুণ বাড়ানো হয়েছে। তবে সচেতন মহলের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ের ছোট দালালরা ধরা পড়লেও পাচারের মূল অর্থদাতা ও হোতারা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “আর্থিক দৈন্যতা ও উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা সক্রিয় রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ না করলে এবং আন্তর্জাতিক এই পাচার চক্রের শিকড় উপড়ে না ফেললে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধ করা সম্ভব নয়।”
বেসরকারি সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের কক্সবাজার অফিসের সমন্বয়ক মুহাম্মদ শাহ আলম জানান, তারা পাচার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছেন। তবে সাগরে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থলপথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা জরুরি। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানিয়েছেন, নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা সভায় মানবপাচারের নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে আসা ঠেকাতে চেকপোস্টগুলোতে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে এবং দালালের তথ্য দিলেই পুরস্কারের ব্যবস্থাও ভাবছে প্রশাসন।
















