আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজলেও রাজধানীর আকাশে বইছে শঙ্কার কালো মেঘ। নির্বাচনের ঠিক ৩২ দিন আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হাড়হিম করা এক তথ্য- রাজধানীর রাজপথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৪০১ জন চিহ্নিত অবৈধ অস্ত্রধারী। তাদের হাতে রয়েছে দুই সহস্রাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ।
গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার না হওয়ায় এই উদ্বেগ চরম আকার ধারণ করেছে। পেশাদার খুনি, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের হাতে থাকা এসব মরণাস্ত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন ত্রাসের সৃষ্টি করছে, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ করছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের নিরাপত্তাকে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর মতিঝিল বিভাগে অবৈধ অস্ত্রধারীদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি, সেখানে ১১৮ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রয়েছে। এছাড়া ওয়ারীতে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০ এবং রমনা বিভাগে ৩৬ জন অস্ত্রধারী তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রেখেছে। সারা দেশের প্রেক্ষাপট আরও ভয়াবহ; ৭৫৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী ও অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ১ হাজার ৮১৫টি অস্ত্র মামলা দায়ের হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র হলো ডিএমপি এলাকায়, যেখানে অস্ত্র মামলা বৃদ্ধির হার প্রায় ১৯৭ শতাংশ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে পুলিশের সেই ১ হাজার ৩৩৫টি লুণ্ঠিত অস্ত্র, যেগুলোর কোনো হদিস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জুলাই-আগস্টের বিশৃঙ্খলায় সারা দেশের ৪০০-এর বেশি থানা থেকে ৫ হাজার ৮১৮টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে বড় একটি অংশ উদ্ধার হলেও ১৩৩৫টি আধুনিক অস্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ এখনও বেহাত রয়ে গেছে। এমনকি খোদ গণভবন থেকে খোয়া যাওয়া এসএসএফ-এর ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্রের হদিস মেলেনি।
গত মঙ্গলবার এক সভায় আইজিপি বাহারুল আলম এই পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ছোট ও ভারী অস্ত্রগুলো নির্বাচনি প্রচারণার সময় রাজনৈতিক সংঘর্ষে ব্যবহার হতে পারে।
এই অস্ত্রধারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৭টি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৩২ জন বন্দির মধ্যে এখনও ৭১৩ জন পলাতক রয়েছে, যারা এই অস্ত্র চালনার মূল কারিগর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম এবং র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ দাবি করছেন যে, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ এর মাধ্যমে তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে অভিযান না চালালে অবৈধ অস্ত্রের এই ঝনঝনানি থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
নির্বাচন কমিশনও এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক। কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র ও পলাতক আসামিদের বিষয়ে তারা নিয়মিত আইজিপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে সংশয় কাটছে না- এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রাজপথে থাকা অবস্থায় কতটা নির্ভয়ে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন?
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হওয়ার পর থেকে মাত্র ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও তালিকার সিংহভাগ অস্ত্রধারী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হওয়ায় এখন সাধারণ মানুষ ও সিভিল সোসাইটির দাবি- দ্রুততম সময়ে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে একটি শঙ্কামুক্ত নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
















