গুমের ২৫ শতাংশ ঘটনায় জড়িত র্যাব; ডিজিএফআই-এনএসআই কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের আহ্বান
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ উন্মোচন করেছে ‘গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি’। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) গুলশানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী এলিট ফোর্স র্যাব (RAB) বিলুপ্তিসহ একগুচ্ছ কঠোর সংস্কারের সুপারিশ পেশ করেছেন। কমিশনের প্রতিবেদনে গুমকে ‘রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত ডিটেনশন সেন্টারগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্য ও স্মৃতি রক্ষার জাদুঘরে রূপান্তর করতে হবে।
গত রবিবার (০৪ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর গতকাল কমিশনের কার্যালয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী।
অপরাধের পরিসংখ্যান ও বাহিনীর ভূমিকা
কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল বাহিনীগুলোর পদ্ধতিগত চর্চা।
- জড়িত বাহিনী: গুমের অভিযোগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঘটনায় র্যাব সরাসরি জড়িত ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পুলিশ (২৩%)। এছাড়া সিটিটিসি, ডিজিএফআই এবং এনএসআই ব্যাপক হারে গুমের সাথে যুক্ত ছিল।
- সমন্বিত অভিযান: প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদা পোশাকে বা প্রশাসনের পরিচয়ে অপহরণের ধরণ থেকে স্পষ্ট যে, এগুলো একক ও যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় কমান্ডের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছে।
প্রধান সুপারিশসমূহ
গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে কমিশন যে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো করেছে: ১. র্যাব বিলুপ্তি: বিতর্কিত এলিট ফোর্স র্যাব বিলুপ্ত করা এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রত্যাহার করা। ২. আইনি সংস্কার: ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিল বা মৌলিক পরিবর্তন এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের ১৩ ধারা বাতিল করা। ৩. জবাবদিহিতা: সব বাহিনীর জন্য কঠোর আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ চালু করা। ৪. আয়নাঘর থেকে জাদুঘর: বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ গুলোকে বিলীন না করে সেগুলোকে স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা। ৫. রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ: গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ করে সেগুলোর কাঠামোগত সংস্কার করা।
গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার
বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্ষমতার লোভে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলায়। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই-এর ইসলামী ব্যাংক দখল বা মিডিয়া হাউস দখল কি তাদের কাজ ছিল? সদ্য বিদায়ী সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।”
শনাক্তকরণ ও ডিএনএ পরীক্ষা
কমিশন জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে সিংহভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁদের শনাক্ত করতে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্তে কমিশন এ পর্যন্ত ৪০টি ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে, যার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টিই ছিল র্যাবের নিয়ন্ত্রণে।














