বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের এক বছর পরও সিরিয়া নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো জাতীয় সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী নতুন করে গড়ে তোলা। তবে এই প্রক্রিয়ায় সামনে রয়েছে বহু জটিল চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ সময় ধরে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে দেখা হতো শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার এক কঠোর হাতিয়ার হিসেবে, যা ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন সরকার সেই পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন অন্তর্বর্তী সরকার সেনা পুনর্গঠন ও সদস্য নিয়োগের কাজ শুরু করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বাহিনী গড়া, যার আনুগত্য থাকবে রাষ্ট্রের প্রতি, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়। আলেপ্পো শহরে সামরিক একাডেমি থেকে সদ্য পাস করা সেনাসদস্যদের এক অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুরহাফ আবু কাসরা বলেন, সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সিরিয়ার জন্য উপযুক্ত একটি সেনাবাহিনী গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি জানান, সব শাখার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি জারি করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও কঠিন হতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মানসিকতা বদলে তাদের একটি পেশাদার ও সংগঠিত সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করা। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নতুন সদস্য যাচাই-বাছাই করা, রুশ সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখা হবে কি না, দক্ষিণ সিরিয়ার বাহিনী ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসকে একীভূত করা এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ সেনাবাহিনী গড়ে উঠলে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার পথও প্রশস্ত হবে। তবে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একীভূত করতে ব্যর্থ হলে দেশটি আবার বিভাজন ও সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আসাদ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়ে। অনেক সেনা পালিয়ে যায়, কেউ আত্মগোপনে থাকে, আবার কেউ অস্ত্র ও পরিচয়পত্র জমা দেয়। এর পরপরই ইসরায়েল সিরিয়াজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, আসাদ সরকারের পতনের কয়েক দিনের মধ্যেই সিরিয়ার কৌশলগত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সিরীয় সেনাবাহিনী কার্যত শূন্য থেকে শুরু করছে। বহু অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও সেনাকে বাদ দেওয়ায় মধ্য ও উচ্চ পর্যায়ের সামরিক নেতৃত্বে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও যাচাইয়ের পর প্রায় তিন হাজার পুরোনো সেনাকে ফের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবু প্রশিক্ষিত ও যুদ্ধঅভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাব বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে।
নতুন সরকার ব্যাপক হারে নিয়োগ শুরু করলেও দ্রুততার কারণে যাচাই-বাছাই অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বহু তরুণ এই বাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী হলেও এতে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আরেকটি সংবেদনশীল ইস্যু হলো বিদেশি যোদ্ধাদের ভূমিকা। পশ্চিমা দেশগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে বিদেশিদের কোনো স্থান দেওয়া যাবে না। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা আশ্বাস দিয়েছেন, এসব যোদ্ধা মূল দায়িত্বে থাকবে না এবং তারা কোনো দেশের জন্য হুমকি হবে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার অবস্থানও দ্রুত বদলেছে। এক সময় রাশিয়া ও ইরান ছিল আসাদ সরকারের প্রধান মিত্র। আসাদ মস্কোতে আশ্রয় নেওয়ার পর নতুন সরকার সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশের সমর্থন পেতে শুরু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে। তবে সামরিক কাঠামো ও সরঞ্জামে রুশ প্রভাব এখনো বড় বাস্তবতা, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোটে সিরিয়ার অন্তর্ভুক্তির পর নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে। তুরস্কও প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও দেশের ভেতরে আস্থা অর্জন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে উপকূলীয় অঞ্চল ও দক্ষিণের সুয়াইদায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, যা সেনাবাহিনীর ওপর সংখ্যালঘুদের আস্থা কমিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুন্নি আরব জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখলেও সংখ্যালঘুদের মধ্যে সেই বিশ্বাস এখনো তৈরি হয়নি।
এই অনাস্থা কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার চুক্তি থাকলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
সব মিলিয়ে, সিরিয়ার নতুন সরকারের সামনে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন শুধু সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনেরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সাফল্যই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে দেশটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।
















