বেলফাস্ট, উত্তর আয়ারল্যান্ড — নতুন বছরের আগের রাতে যখন বেলফাস্টের আকাশ আতশবাজিতে আলোকিত, তখন শহরের রাস্তায় ছিল ভিন্ন এক উত্তেজনা। উৎসবের পাশাপাশি শত শত মানুষ জড়ো হন ব্রিটিশ কারাগারে অনশনে থাকা ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের প্রতি সংহতি জানাতে। তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয় এমন দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে, যা বেলফাস্টের ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে।
ফলস রোড এলাকায় আইরিশ রিপাবলিকান আন্দোলনের দেয়ালচিত্রের পাশে রয়েছে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের ছবি। আন্তর্জাতিক দেয়াল হিসেবে পরিচিত স্থানটি এখন অনেকের কাছে ফিলিস্তিনের দেয়াল নামে পরিচিত। সেখানে নিহত ফিলিস্তিনি লেখক রেফাত আলারির কবিতার পংক্তি, গাজার শিল্পীদের পাঠানো চিত্র এবং স্থানীয় শিল্পীদের আঁকা নতুন বার্তা একত্রে স্থান পেয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেলফাস্টের দেয়ালে যোগ হয়েছে নতুন কিছু লেখা। ন্যায়বিচারের জন্য ক্ষুধার্তদের আশীর্বাদ জানানো বাক্যের পাশে দেখা যাচ্ছে আইরিশ অনশন আন্দোলনের প্রতীক ববি স্যান্ডসের ছবি। তার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ব্রিটিশ কারাগারে অনশনে থাকা চার ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীর নাম, যারা দিন যত গড়াচ্ছে তত শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী প্যাট্রিসিয়া ম্যাককিওন বলেন, এই শহর কখনোই কণ্ঠরোধ বা প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, অন্যায়ভাবে আটক তরুণরা ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর এই কারণেই তাদের প্রতি সমর্থন জানানো জরুরি।
বেলফাস্টের এই বিক্ষোভ একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অংশ, যেখানে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করা হচ্ছে। অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। তারা সবাই প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এবং বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন। সমর্থকদের দাবি, আইনি সব পথ ব্যর্থ হওয়ায় অনশনই তাদের শেষ ভরসা।
এই কর্মীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ ও একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অনশনকারীদের দাবি জামিনে মুক্তি, কারাগারে চিঠিপত্র ও পড়ার উপকরণে বাধা বন্ধ, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা এবং প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার।
বর্তমানে হেবা মুরাইসি টানা ৬১ দিন, তেউতা হোক্সা ৫৫ দিন, কামরান আহমেদ ৫৪ দিন এবং লুই চিয়ারামেলো ৪১ দিন ধরে অনশনে রয়েছেন। ইতোমধ্যে দুজনকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। আন্দোলনকারীরা একে ১৯৮১ সালের পর যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় অনশন আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করছেন, যা স্পষ্টভাবে আইরিশ অনশন আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত।
১৯৮১ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে রাজনৈতিক মর্যাদার দাবিতে অনশন করেছিলেন আইরিশ রিপাবলিকান বন্দীরা। সেই আন্দোলনে ববি স্যান্ডসসহ ১০ জন প্রাণ হারান। এই ইতিহাস বেলফাস্টবাসীর স্মৃতিতে আজও গভীরভাবে গেঁথে আছে।
সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী জিউস ফর প্যালেস্টাইন আয়ারল্যান্ডের সদস্য সু পেন্টেল বলেন, ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুরতা তিনি ভুলতে পারেন না। তার মতে, নতুন প্রজন্ম একই চেতনা নিয়ে আজ ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে।
ববি স্যান্ডসের দেয়ালচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে সাবেক অনশনকারী ও বর্তমানে সিন ফেইনের রাজনীতিক প্যাট শিহান আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি চলতে থাকলে আবারও মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ৪০ দিনের পর অনশন জীবনঘাতী হয়ে ওঠে এবং শারীরিকভাবে অনশনকারীরা এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে।
আয়ারল্যান্ডে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থনের পেছনে রয়েছে উপনিবেশ, দমন ও আটক অভিজ্ঞতার মিল। গাজায় যা ঘটছে তা আইরিশ জনগণের মধ্যে গভীর সহমর্মিতা তৈরি করেছে বলে মনে করেন শিহান।
এই সহমর্মিতা রাজনৈতিক অবস্থানেও প্রতিফলিত হয়েছে। আয়ারল্যান্ড ইতোমধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে গাজা নিয়ে মামলায় যুক্ত হয়েছে। তবে অনেক আন্দোলনকারী মনে করেন, এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় এবং আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বেলফাস্টের রাজনীতিতেও গাজা যুদ্ধ বড় প্রভাব ফেলেছে। সিটি হলের সামনে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলন নিয়ে বিতর্ক, স্টর্মন্ট অ্যাসেম্বলিতে সংকট এবং বিভিন্ন এলাকায় বিপরীতমুখী অবস্থান শহরের পুরনো বিভাজনকে আবার সামনে এনেছে।
তবুও বেলফাস্টের রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তাদের সংহতি কোনো জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, বরং মানবতার প্রশ্ন। আন্দোলনকারীদের মতে, সব ধরনের সংহতিই শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
















