ভেনেজুয়েলায় বড় পরিসরের সামরিক হামলা চালানো হয়েছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। তার দাবি, ওই অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার ভেতরে এই হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যম জানায়। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এমন হামলার আশঙ্কা করছিলেন দেশটির নাগরিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজ ও সিবিএস নিউজসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম এই হামলার খবর প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ভেনেজুয়েলার জন্য এটি একটি নতুন ভোর। তার ভাষায়, অত্যাচারী শাসকের পতন হয়েছে এবং তাকে এখন তার কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে এই হামলাকে চরম সামরিক আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ও জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে গুরুতর সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা জানানো হচ্ছে।
এই ঘটনার পর বিভিন্ন দেশ তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার বিষয়ে পুরো বিশ্বকে সতর্ক করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, শান্তি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবজীবন ও মর্যাদা রক্ষা যে কোনো সশস্ত্র সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। তিনি ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরবর্তীতে ভেনেজুয়েলা সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণাও দেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ কানেল কড়া ভাষায় এই হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক হামলা চালিয়েছে এবং এটিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে আখ্যা দেন। কিউবা সরকার এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি প্রতিক্রিয়া দাবি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করে।
রাশিয়া এই ঘটনাকে সশস্ত্র আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি। তারা জোর দিয়ে বলে, ভেনেজুয়েলার জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি দাবি করেন, মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছে যে মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি মামলা করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কারাকাসে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ইইউ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্মান জানাতে সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানায়। ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত ইউরোপীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্তেজনা কমানো, সংযম এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দেশটিতে বসবাসরত ইতালীয় নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বর্তমানে প্রায় এক লাখ ষাট হাজার ইতালীয় নাগরিক ভেনেজুয়েলায় বসবাস করছেন, যাদের অনেকেরই দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।
















