দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ পয়েন্ট থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে একটি ছোট নৌকায় দাঁড়িয়ে পাখিপ্রেমীরা একের পর এক সামুদ্রিক পাখির নাম ধরে ডাকছেন। দূর আকাশে ভেসে ওঠা আলবাট্রস ও অন্যান্য বিরল সামুদ্রিক পাখি দেখতেই কেপ টাউন থেকে এই ভ্রমণের আয়োজন করেছে একটি অলাভজনক সংস্থা।
গ্রীষ্মের উজ্জ্বল দিনে নীল আকাশের নিচে নৌকাটি যখন সমুদ্রে এগোয়, তখন চালক রেডিওতে খোঁজ নিতে থাকেন মাছ ধরার ট্রলারগুলোর অবস্থান। একটি ট্রলারের কাছে পৌঁছাতেই আশপাশে ভিড় করতে থাকে শত শত সামুদ্রিক পাখি। মাছ ধরার জাহাজের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাদের। জেলেরা মাছ পরিষ্কার করার সময় যে মাথা ও নাড়িভুঁড়ি সমুদ্রে ফেলে দেন, সেটাই পাখিদের আকর্ষণ করে।
কিন্তু এই সহজ খাবারের খোঁজেই আলবাট্রসসহ বহু পাখিকে প্রাণ দিতে হয়। দীর্ঘ লাইনে ঝুলন্ত হাজার হাজার বড়শিতে টোপ ধরতে গিয়ে পাখিরা আটকে যায়, পানির নিচে টেনে নিয়ে ডুবিয়ে মেরে ফেলে এই মাছ ধরার পদ্ধতি। একটি লংলাইন অনেক সময় ১০০ কিলোমিটার লম্বা হয়, যেখানে চার হাজার পর্যন্ত বড়শি থাকে।
এই ধরনের অনিচ্ছাকৃত প্রাণী মৃত্যুকে বলা হয় বাইক্যাচ। শুধু বড়শিই নয়, জালের সঙ্গে যুক্ত তারের লাইনে জড়িয়েও পাখির মৃত্যু ঘটে। আলবাট্রসরা জীবনের বড় একটি সময় সমুদ্রে কাটায়, ফলে মাছ ধরার জাহাজের ঝুঁকিতে তারা সবচেয়ে বেশি পড়ে।
পাখি সংরক্ষণ সংস্থা বার্ডলাইফ দক্ষিণ আফ্রিকার আলবাট্রস টাস্ক ফোর্স গত দুই দশক ধরে এই সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আলবাট্রসের মাত্র ২২টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ১৫টিই মাছ ধরার কার্যক্রমের কারণে বিপন্ন। এদের প্রজনন প্রক্রিয়াও ধীর। তারা আজীবনের জন্য জুটি বাঁধে এবং দুই বছরে মাত্র একটি ডিম পাড়ে। মা-বাবা দুজনই ছানাকে বড় করে। ফলে একজন সঙ্গী মারা গেলে শুধু ছানাই নয়, পুরো প্রজনন চক্রই ভেঙে পড়ে।
এই ঝুঁকি কমাতে কার্যকর সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বার্ড-স্কেয়ারিং লাইন। রঙিন প্লাস্টিকের ফিতা ও দড়ি দিয়ে তৈরি এই লাইনগুলো জালের ওপরে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা বাতাসে নড়াচড়া করে পাখিদের দূরে রাখে। সহজ ও সস্তায় তৈরি এই ব্যবস্থা পাখির প্রাণ বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
বার্ডলাইফ এই লাইন তৈরিতে প্রতিবন্ধী কর্মীদের একটি সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে। এতে একদিকে সংরক্ষণ কার্যক্রম এগোচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী মানুষদের আয়ের সুযোগ ও আত্মমর্যাদা বাড়ছে।
এই উদ্যোগে জেলেদেরও আর্থিক লাভ রয়েছে। মাছ ধরার সময় পাখি ধরা পড়লে বড় মাছ নষ্ট হয়। একটি টুনা মাছের দাম যেখানে হাজার হাজার ডলার, সেখানে পাখি ধরা পড়া জেলেদের জন্য ক্ষতির কারণ। তাই পাখি দূরে রাখলে জেলেদের লাভও বাড়ে।
তবে সময়ের চাপ, নিরাপত্তা ও কোটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে সব জেলে সব সময় এই লাইন ব্যবহার করেন না। তবু আলবাট্রস টাস্ক ফোর্স গঠনের পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার মাছ ধরার এলাকায় সামুদ্রিক পাখির মৃত্যু প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে।
এই সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়ার আশাই এখন সংরক্ষণকর্মীদের, যাতে সমুদ্রের আকাশে আলবাট্রসের উড়ান বহুদিন ধরে টিকে থাকে।
















