যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরান যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সতর্কতা দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, দেশটির বিরুদ্ধে আক্রমণ হলে তার জবাব হবে তীব্র ও অনুশোচনাজনক।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পেজেশকিয়ান এই অবস্থান জানান। তার একদিন আগে ফ্লোরিডায় নিজের বাসভবনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। ওই বৈঠকের পর ট্রাম্প আবারও ইসরায়েলের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে ইরানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিলেও এবার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও হামলার আওতায় আনার কথা বলেছেন ট্রাম্প, যা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রত্যাশা ছিল। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থাও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো প্রমাণ পায়নি। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না।
এই বক্তব্যগুলো নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানে এক হাজার একশোর বেশি মানুষ নিহত হন এবং ইসরায়েলে প্রাণ হারান ২৮ জন। সেই যুদ্ধের কয়েক মাস পর আবারও উত্তেজনা বাড়ছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর। এই মন্তব্য আসে এমন সময়, যখন ট্রাম্প মারালাগো রিসোর্টে সাংবাদিকদের জানান, ইরান যদি আবার পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ইরান আবার শক্তি সঞ্চয় করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র তা গুঁড়িয়ে দেবে। তিনি আরও বলেন, তেহরান দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র উন্নয়ন অব্যাহত রাখলে পারমাণবিক স্থাপনার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রেও হামলা সমর্থন করবেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, জুনের সংঘাতে বড় ক্ষতি হলেও ইরান নীরবে আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ে তুলছে। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা দেশটির গণমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায় যা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থামাবে, তাহলে তেহরানের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
পেজেশকিয়ান সম্প্রতি এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি আশির দশকের ইরান ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বেশি জটিল ও কঠিন, যে যুদ্ধে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, জুনের যুদ্ধে ইসরায়েল ১২ দিনে ইরানের ২৭টি প্রদেশে প্রায় ৩৬০টি হামলা চালায়। এতে সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র ও সরকারি ভবন লক্ষ্যবস্তু হয়। ওই হামলায় আনুমানিক এক হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয় এবং ৩০ জনের বেশি শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও অন্তত ১১ জন পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে পাঁচ শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে প্রায় ৩৬টি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে। ট্রাম্প দাবি করেন, হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এ দাবির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, ইরান গোপনে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত লুকিয়ে রাখতে পারে এবং কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে সক্ষম।
সব ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধবিরতির পর দেশটির সামরিক শক্তি আরও বেড়েছে। এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান দাবি করেন, অস্ত্র ও জনবলের দিক থেকে এখন ইরানের সেনাবাহিনী আগের চেয়ে শক্তিশালী।
এই যুদ্ধ ইরানের ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারেনি। তেহরানে উল্লেখযোগ্য কোনো বিক্ষোভ দেখা যায়নি এবং বোমাবর্ষণের মধ্যেও রাজধানীতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটাই অব্যাহত ছিল।
















