ভোর হওয়ার আগেই বেইজিংয়ের উপকণ্ঠের বিস্তীর্ণ ঘাসভূমিতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকেন সিলভা গু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, দূরে ঘুমিয়ে থাকা মহানগরী, আর অন্ধকারে শ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। চোখে তার সতর্ক দৃষ্টি, অন্ধকার চিরে তিনি খুঁজে ফেরেন জীবনের স্পন্দন। তিনি জানেন, এই ভোরেই আসবে শিকারিরা।
সূর্য ওঠার ঠিক আগে পায়ের শব্দ ভেসে আসে। গোপনে, নিঃশব্দে এগিয়ে আসে পাখি শিকারিরা। সিলভা সবার আগে এগিয়ে যান, তার পেছনে ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকরা। গাছের সারি পেরিয়ে একটি ফাঁকা জায়গায় ঢুকতেই চোখের সামনে ধরা পড়ে অদৃশ্য জালের মতো পাতলা এক ফাঁদ। এতটাই সূক্ষ্ম যে কাছে না গেলে বোঝার উপায় নেই।
চীনে প্রতি বছর হাজার হাজার গানের পাখি ধরা পড়ে এই ধরনের জালে। কেউ যায় পোষা পাখির খাঁচায়, কেউ বা মাংসের বাজারে। অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি আর কর্মসংস্থানের সংকটে এই অবৈধ পাখি ব্যবসা অনেকের কাছে সহজ আয়ের পথ হয়ে উঠেছে। একটি সুন্দর সাইবেরিয়ান রুবিথ্রোটের দাম কালোবাজারে প্রায় দুই হাজার ইউয়ান পর্যন্ত উঠতে পারে, যা অনেক কৃষকের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি।
সিলভা বলেন, মানুষ শাসিত এই পৃথিবীতে পাখিদের বাঁচাতে চান তিনি। পাখিরা তার কাছে শুধু প্রাণী নয়, তারা স্বপ্ন। তিনি বলেন, তার স্বপ্নে তিনি প্রায়ই উড়তে দেখেন নিজেকে।
অক্টোবর মাসে চীনের আকাশ হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের ব্যস্ত মহাসড়ক। সাইবেরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার দীর্ঘ গ্রীষ্ম পেরিয়ে শীতের আগে তারা উড়ে যায় উষ্ণ অঞ্চলের দিকে। চীন হয়ে ওঠে তাদের পথের বড় অংশ। বিশ্বের প্রায় তেরো শতাংশ পাখির আবাস এই দেশে, যার বড় একটি অংশ পরিযায়ী।
বেইজিংয়ের শহরতলির এই ঘাসভূমি ছোট পাখিদের জন্য আশ্রয়। একই সঙ্গে এটি শিকারিদের স্বর্গ। পাতলা জাল টানানো থাকে বাঁশের খুঁটিতে। এমনই এক জালে আটকে ছিল একটি মেডো পিপিট। ছটফট করতে করতে তার পা আরও জালে জড়িয়ে যাচ্ছিল। এটি চীনে সংরক্ষিত প্রজাতির পাখি।
শিকারি বুঝতে পেরে দৌড় দেয়। পালাতে পালাতে সে কয়েকটি পাখি ছুড়ে ফেলে ঝোপের ভেতর। কিন্তু সিলভা পথ আটকে দাঁড়ান। অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি জানেন কীভাবে পুলিশ আসা পর্যন্ত শিকারিকে আটকে রাখতে হয়। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে।
তিন দশকের কাছাকাছি বয়সী সিলভা এই কাজ করেন বিনা পারিশ্রমিকে। নিজের সঞ্চয় খরচ করে, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে তিনি পাখি বাঁচান। গত দশ বছর ধরে তিনি বেইজিংয়ের পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, পাখি শিকারও বড় অপরাধ।
শৈশবে বেইজিং ছিল তার কাছে সবুজ আর প্রাণে ভরা। নব্বইয়ের দশকের সেই শহর বদলে গেছে দ্রুত নগরায়ণে। ঘাসভূমি কমেছে, পাখির বাসস্থান সংকুচিত হয়েছে। সেই পরিবর্তন তাকে ব্যথিত করেছে, আর সেখান থেকেই তার সংরক্ষণ আন্দোলনের শুরু।
এই পথে তাকে মারধরের শিকারও হতে হয়েছে। বড় এক পাখি ব্যবসায়ী তাকে আক্রমণ করেছিল। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সময়ের সঙ্গে ঝরে গেছে। কারণ এই লড়াই ক্লান্তিকর, ঝুঁকিপূর্ণ।
এখন তিনি প্রযুক্তির সাহায্য নেন। স্যাটেলাইট ছবিতে খুঁজে বের করেন শিকারিদের চলার পথ, পাখির যাত্রাপথের সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করেন সম্ভাব্য ফাঁদ পাতা এলাকা।
আজও বেইজিংয়ের নদীর ধারে ছোট ছোট খাঁচায় পাখি বিক্রি হয়। বয়স্ক অনেক মানুষ এই পাখি কেনেন সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে, যা চীনে শতাব্দীপ্রাচীন রীতি। অনেকেই জানেন না, এটি আইনত অপরাধ।
সরকার এখন ধীরে ধীরে কঠোর হচ্ছে। পাখি সংরক্ষণকে পরিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। এই পরিবর্তন সিলভাকে কিছুটা আশাবাদী করেছে।
গত দশ বছরে তিনি সরাসরি বিশ হাজারের বেশি পাখি উদ্ধার করেছেন। তার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম পাখির কণ্ঠের মূল্য বুঝবে। ততদিন পর্যন্ত তিনি একাই লড়ে যাবেন।
প্রতি পরিযায়ী মৌসুমে রাতের অন্ধকারে তিনি হাঁটবেন বেইজিংয়ের ঘাসভূমিতে। তার আশা, একদিন শহরের আকাশ আবার ভরে উঠবে শৈশবের সেই গানের সুরে।
















