নীতি-আদর্শের ডিগবাজিতে এনসিপিতে মহাধস; আবু সাঈদ-মুগ্ধদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর নতুন বন্দোবস্ত আর তারুণ্যের স্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে পুঁজি করে ক্ষমতার পাদপ্রদীপে আসা এই তরুণ নেতারা শেষ পর্যন্ত কেবল এমপি হওয়ার লোভে বিপরীত আদর্শের ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ শক্তি জামায়াতে ইসলামীর নৌকায় পা রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি জোট গঠন নয়, বরং ১৪শ’ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ‘জুলাই চেতনা’কে জামায়াতের কাছে লিজ দেওয়ার শামিল। এই ‘কুমিরীয়’ রাজনৈতিক মেরুকরণে এনসিপির অস্তিত্ব এখন বিলীন হওয়ার পথে।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | রাত ০৮:৩০ মিনিট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপির এই ডিগবাজি এখন দেশজুড়ে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এক সময় বিএনপিকে এড়িয়ে চললেও এখন জামায়াতের ‘বি-টিম’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এনসিপির ভেতর শুরু হয়েছে নজিরবিহীন বিদ্রোহ।
আদর্শের পরাজয় ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ
জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রতিবাদে এনসিপির প্রভাবশালী নেত্রীরা একে একে পদত্যাগ করছেন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে কড়া চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন জুলাই অভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির গত এক বছর ধরে এনসিপির ভেতর ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ ও ‘সাবোটাজ’ চালিয়েছে। এমনকি নারী সদস্যদের চরিত্রহননের মতো নোংরা রাজনীতিও করা হয়েছে।
বিক্ষুব্ধ নেত্রী সামান্তা শারমিন আক্ষেপ করে লিখেছেন, “জামায়াত নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়, এই সিদ্ধান্ত হজম করে মরতেও পারব না আমি।” পদত্যাগকারী নেতারা বলছেন, ৩০০ আসনে একক লড়াইয়ের কথা বলে এনসিপি আসলে জামায়াতের জন্য ‘ঠিকাদারি’ করছে।
এমপি পদের মোহ ও আসন ভাগাভাগি
সূত্রের খবর, বিএনপির সঙ্গে জোট করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই এনসিপি নেতারা জামায়াতের দিকে ঝোঁকেন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় এই জোটে এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের ‘ভারতবিরোধী’ তকমা ঝেড়ে ফেলতে এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিজেদের একক কর্তৃত্ব জাহির করতে এনসিপিকে ‘শিল্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
‘গুপ্ত শিবির’ ও মিয়া গোলাম পরওয়ারের হুংকার
এনসিপি নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কেউ ছাত্রলীগের হয়ে হেলমেট বাহিনীতে ছিলেন, কেউ বা বাম রাজনীতি থেকে ছাত্রশিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। গত ২১ অক্টোবর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সেই বিতর্কিত মন্তব্য—“জন্ম নিয়েই বাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ো না”—এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এনসিপিকে নিজের ‘সন্তান’ দাবি করে জামায়াত এখন তাদের গিলে খাওয়ার উপক্রম করেছে।
আবু সাঈদ-মুগ্ধদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা?
ছাত্রজনতার আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব দেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই এনসিপির এই নেতৃত্বকে বর্জন করে আসছিল। এখন জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যেমন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বিক্রি করে ক্ষমতা দখল করেছিল, এনসিপিও তেমনি ‘জুলাই চেতনা’র ব্যাপারী সেজে শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের নেতৃত্বে এনসিপি জোটভুক্ত হওয়া তারুণ্যের নিজস্বতা হারানোর চূড়ান্ত পদক্ষেপ। বিএনপির লাটাই যেমন তাদের নিজেদের হাতে থাকে, এনসিপির ক্ষেত্রে লাটাই এখন পুরোপুরি জামায়াতের হাতে। এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে কোনো তরুণ দল নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখালে জনগণ আর তাদের বিশ্বাস করবে না।
















