কোনাক্রির ভোরে ব্যালট বাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ। দীর্ঘ নীরবতার পর আজ গিনি আবার ভোট দিচ্ছে। সামরিক অভ্যুত্থানের ছায়া পেরিয়ে এই প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর এই নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে সম্ভাব্য মুখ সেই মানুষটি, যিনি চার বছর আগে বন্দুকের শক্তিতে ক্ষমতা নিয়েছিলেন জেনারেল মামাদি দুম্বুইয়া।
রবিবার সকাল সাতটায় ভোটকেন্দ্র খুলেছে, সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ হবে। প্রায় সাত মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটার আজ তাদের রায় দেবেন। আটজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও বাস্তবতার মঞ্চে দুম্বুইয়ার পথ প্রায় একক বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট আলফা কঁদে এবং দীর্ঘদিনের বিরোধী নেতা সেলু দালেইন দিয়ালো রয়েছেন নির্বাসনে।
খনিজসমৃদ্ধ এই দেশে দারিদ্র্য এখনও মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। সেই বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে, তাদের দাবি এই ভোটের ফল আগেই লেখা।
গিনির ইতিহাস বারবার ভেঙেছে গণতন্ত্রের স্বপ্ন। ২০১০ সালে আলফা কঁদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, তা নিভে যায় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। সেই সময় বিশেষ বাহিনীর সাবেক কমান্ডার দুম্বুইয়া ক্ষমতা দখল করেন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি আবার ফিরে গেছে স্বাধীনতার পর থেকে পরিচিত শাসনের পথে, যেখানে ক্ষমতা মানে কর্তৃত্ব।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান জানিয়েছেন, অস্থায়ী ফলাফল দুই দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এই ভোট ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা হয়েছে। বিক্ষোভ নিষিদ্ধ, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রুদ্ধ, বিরোধীদের চলাচলে বাধা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, প্রচারণা সময় ছিল ভয়ের আবহে ভরা। বিরোধীদের ভয় দেখানো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুমের অভিযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর চাপ এই সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে।
নির্বাসিত বিরোধী নেতা দিয়ালো এই ভোটকে আখ্যা দিয়েছেন ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নাটক হিসেবে। তার মতে, এটি পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখলের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।
এর আগে সেপ্টেম্বরে নতুন সংবিধান অনুমোদন পায় গণভোটে। বিরোধীরা সেটিও বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। সেই সংবিধানই সামরিক নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদ বাড়িয়ে সাত বছর করেছে।
তবু দেশের ভেতরে দুম্বুইয়ার জনপ্রিয়তা অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বক্সাইট মজুত এবং সিমানদুতে বিশাল লৌহ আকরের প্রকল্প নতুন করে আশার কথা বলছে। সরকার দাবি করছে, এই সম্পদ থেকে গিনি এবার নিজের প্রাপ্য পাবে। খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর এই নীতি অনেক তরুণের চোখে নেতৃত্বের শক্ত বার্তা।
গিনির জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। রাজধানী কোনাক্রির এক তরুণ মেকানিকের কণ্ঠে সেই অনুভূতি ধরা পড়ে। তার মতে, দুম্বুইয়া পুরনো রাজনীতিকে বিদায় জানানোর সুযোগ। তিনি স্বীকার করেন, দুর্নীতি আছে, কিন্তু আশা করেন সময়ের সঙ্গে সেগুলো ঠিক হয়ে যাবে।
আজ গিনির আকাশে ভাসছে প্রশ্ন আর প্রত্যাশা। ব্যালটের কাগজে লেখা সিদ্ধান্ত কি সত্যিই বদলাবে দেশের ভাগ্য, নাকি ইতিহাস আবারও ঘুরে দাঁড়াবে একই জায়গায়। সময়ই দেবে সেই উত্তর।
















