মধ্য এশিয়ায় তাজিকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি মাসে আফগানিস্তান থেকে তাজিক ভূখণ্ডে একাধিক সশস্ত্র অনুপ্রবেশের ঘটনার কথা জানিয়েছে তাজিক সরকার। এসব ঘটনার ফলে কাবুলে ক্ষমতাসীন তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গে দুশানবের সম্পর্ক আরও চাপের মুখে পড়েছে।
তাজিক কর্তৃপক্ষের ভাষায়, ‘সন্ত্রাসী’ হামলাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। দুশানবে ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কর্মরত চীনা নাগরিকও রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে তাজিকিস্তানের শামসিদ্দিন শোখিন জেলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে তিনজনকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাজিকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের বিরোধিতা করে আসছে। দুই দেশের মধ্যে ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বড় একটি অংশই কার্যত অরক্ষিত। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তালেবানের শাসনক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পাঞ্জ নদী বরাবর বিস্তৃত এই সীমান্ত দক্ষিণ তাজিকিস্তান ও উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। তাজিকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার তিনজন সশস্ত্র ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রম করে তাজিক ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। পরদিন সকালে তাদের অবস্থান শনাক্ত হলে সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। এতে অনুপ্রবেশকারীদেরসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়।
হামলাকারীরা কোন গোষ্ঠীর সদস্য, সে বিষয়ে তাজিক কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। তবে ঘটনাস্থল থেকে এম-১৬ রাইফেল, কালাশনিকভ, সাইলেন্সারযুক্ত বিদেশি পিস্তল, হ্যান্ড গ্রেনেড, নাইট-ভিশন যন্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
তাজিকিস্তানের দাবি, গত এক মাসে আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশ থেকে আসা এটি তৃতীয় হামলা, যাতে তাদের নিরাপত্তা সদস্যরা নিহত হয়েছেন। দুশানবে অভিযোগ করেছে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে তালেবান সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। তাজিক সরকার তালেবানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
যদিও হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে তাজিকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি, তবে ঘটনাগুলোর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চীনা কোম্পানি ও নাগরিকদের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজরে এসেছে।
চীন তাজিকিস্তানের অন্যতম প্রধান ঋণদাতা এবং অবকাঠামো, খনি ও সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। দুই দেশ পূর্ব তাজিকিস্তানের পামির পর্বতমালার মধ্য দিয়ে ৪৭৭ কিলোমিটার সীমান্তও ভাগ করে নিয়েছে, যা চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের কাছাকাছি।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চীনা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দুটি বড় হামলা ঘটে। ২৬ নভেম্বর সীমান্তবর্তী খাতলন অঞ্চলে একটি চীনা স্বর্ণখনি কোম্পানির স্থাপনায় বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলায় তিনজন চীনা নাগরিক নিহত হন। এর কয়েক দিন পর দারভোজ জেলায় চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় আরও অন্তত দুইজন নিহত হন।
চীনা দূতাবাস এসব ঘটনার পর সীমান্ত এলাকা ছেড়ে চলে যেতে চীনা নাগরিক ও কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে এবং তাজিকিস্তানের কাছে চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত না হলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব আক্রমণে আইএসের খোরাসান শাখা আইএসকেপির ছাপ রয়েছে। তাদের লক্ষ্য তালেবানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সরবরাহকারী হিসেবে অযোগ্য প্রমাণ করা।
তালেবান সরকার চীনা নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং অজ্ঞাত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দায়ী করে তাজিকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি বলেছেন, আফগানিস্তান প্রতিবেশী কোনো দেশের জন্য হুমকি নয় এবং সমস্যা সমাধানে সংলাপের পথ খোলা রয়েছে।
তবে জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে আইএসকেপিসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে, যা তালেবানের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দীর্ঘদিন ধরে তাজিকিস্তান ও তালেবানের সম্পর্ক আদর্শিক বিরোধ ও জাতিগত অবিশ্বাসে জর্জরিত। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর প্রতিবেশীদের মধ্যে তাজিকিস্তানই একমাত্র দেশ যারা তাদের সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও ২০২৩ সাল থেকে বাস্তব প্রয়োজনে সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘনঘটা নতুন ধরনের নিরাপত্তা হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাদাখশান প্রদেশে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বিশেষ করে আফিম চাষ দমন নীতির কারণে স্থানীয় কৃষকদের প্রতিরোধ বেড়েছে।
এদিকে তালেবানের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জটিল রয়ে গেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে সীমান্ত সংঘর্ষ ও পারস্পরিক অভিযোগে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহ দেখাচ্ছে কাবুল। এসবের মধ্যেই তাজিক সীমান্তে সহিংসতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
















