ইসলামাবাদ, পাকিস্তান – প্রায় সাত দশক ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার এই সপ্তাহে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) ৭৫ শতাংশ শেয়ার ৪৮ কোটি ২০ লাখ ডলারে বিক্রি করেছে। সরাসরি সম্প্রচারিত নিলামের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ব্যর্থ বেসরকারিকরণ প্রচেষ্টার অবসান ঘটলেও দেশটির রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
করাচিভিত্তিক সিকিউরিটিজ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান আরিফ হাবিব লিমিটেডের নেতৃত্বে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম নিলামে সর্বোচ্চ দর দেয়। এই জোটে রয়েছে একেডি গ্রুপ হোল্ডিংস, ফাতিমা ফার্টিলাইজার, সিটি স্কুলস নেটওয়ার্ক এবং লেক সিটি হোল্ডিংস। নিলামের পর সামরিক মালিকানাধীন ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফৌজি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডও কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হয়, যা নতুন করে প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই বিক্রি ছিল পিআইএ বেসরকারিকরণের দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে মাত্র ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের একক প্রস্তাব আসায় সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্যের অনেক নিচে থাকায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপেই মূলত এই বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। সাত বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকার বছরের শেষ নাগাদ পিআইএ বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আগেই পিআইএর দুই দশকের বেশি পুরোনো প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের দায় আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে। নিলামে তিনটি পক্ষ অংশ নিলেও ন্যূনতম দর পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় একটি বেসরকারি এয়ারলাইন শুরুতেই বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত আরিফ হাবিব নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম ৭৫ শতাংশ শেয়ারের জন্য ৪৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের প্রস্তাব দিয়ে বিজয়ী হয়।
সরকার জানিয়েছে, এই অর্থের প্রায় ৯২ শতাংশ আবার পিআইএতেই বিনিয়োগ করা হবে এবং বাকি অংশ সরকারি কোষাগারে যাবে। সরকার ২৫ শতাংশ শেয়ার নিজেদের কাছে রেখে দেবে, যার আনুমানিক মূল্য ১৬ কোটি ডলারের বেশি। কনসোর্টিয়াম ভবিষ্যতে অবশিষ্ট শেয়ারও কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ বিমান সংস্থাটি নতুনভাবে চালু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
একসময় পাকিস্তানের গর্ব হিসেবে পরিচিত পিআইএ আন্তর্জাতিক রুটে সাফল্যের সঙ্গে উড়ান চালাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের এমিরেটস এয়ারলাইন্স গঠনে সহায়তার কৃতিত্বও পায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও আর্থিক অনিয়মে সংস্থাটি বিশাল ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এর দায় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭০ কোটি ডলারের বেশি। বর্তমানে বহরের ৩৩টি বিমানের মধ্যে মাত্র ১৮টি সচল রয়েছে।
২০২০ সালে করাচিতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে পিআইএর ফ্লাইট নিষিদ্ধ হয়। পরে দীর্ঘ তদন্ত ও সংস্কারের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
সরকার চুক্তিটিকে সর্বোত্তম সমাধান বলে দাবি করলেও বিরোধী দলগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সংসদীয় তদারকি ও জনমতের তোয়াক্কা না করেই একটি জাতীয় সম্পদ বিক্রি করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন, কার্যত সরকার নগদ মাত্র অল্প অংশ পেয়েছে, বাকি অর্থ নতুন মালিকদের সুবিধার জন্যই বিমান সংস্থায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সরকার এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেছে, মোট হিসাব করলে রাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য আর্থিক মূল্য পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে লোকসান ঠেকানোই ছিল মূল লক্ষ্য।
অর্থনীতিবিদ ও বিমান খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এটি সবচেয়ে কার্যকর পথ। তাদের যুক্তি, পিআইএর মূল্যবান রুট ও ল্যান্ডিং অধিকার ধরে রাখাই লাভজনক, বিক্রি করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হতো।
তবে সামরিক মালিকানাধীন ফৌজি ফার্টিলাইজার কোম্পানির কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হওয়া নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এতে করে বিমান সংস্থাটি এক রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামো থেকে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রভাবের অধীনে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, সামরিক উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বার্তা দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দশকের ব্যর্থতার পর এই বিক্রি একটি বড় অগ্রগতি হলেও বাজারে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। পিআইএর ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে নতুন মালিকদের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতার ওপর।
















