ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বৈঠকে বসেছেন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কোর ওপর চাপ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ওয়াশিংটনকে।
শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন–এর বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভের সঙ্গে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের দিমিত্রিয়েভ জানান, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে এগোচ্ছে এবং রোববারও তা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আলোচনার সূচনা আগেই হয়েছে এবং আজ ও আগামীকাল আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তিনি চাইলে মায়ামির আলোচনায় যোগ দিতে পারেন। রুবিও বলেন, যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক দূর যেতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বছরের শেষ হওয়ার আগেই কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দূতেরা কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অগ্রগতি হলেও ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে, যা কিয়েভ যেকোনো চুক্তির জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে।
রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে তাদের বিস্তৃত দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। মস্কোর ধারণা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিভাজন বাড়লে তারা আরও সুবিধাজনক অবস্থানে যাবে।
এদিকে কিয়েভে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক উদ্যোগে তিনি সমর্থন রাখলেও আলোচনার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো জরুরি। তার ভাষায়, কেবল কূটনীতি যথেষ্ট নয়, পুতিন এখনও সেই মাত্রার চাপ অনুভব করছেন না, যা প্রয়োজন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, ওয়াশিংটন একটি নতুন আলোচনার কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে। তিনি সংশয় প্রকাশ করলেও বলেন, যদি এ ধরনের আলোচনা বন্দিবিনিময় বা শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পথ খুলে দেয়, তাহলে কিয়েভ তা সমর্থন করবে।
সর্বশেষ ইউক্রেন ও রাশিয়ার সরাসরি সরকারি পর্যায়ের আলোচনা হয়েছিল গত জুলাইয়ে ইস্তাম্বুলে, যেখানে বন্দিবিনিময় হলেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মায়ামির বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন পুতিন তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ দিতে সাময়িক হামলা বন্ধের ইঙ্গিত দিলেও জেলেনস্কি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে ইউক্রেনের ওডেসা অঞ্চলে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। একটি বেসামরিক বাস হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্বিরিদেনকো। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপকূলীয় অঞ্চলে হামলায় সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রচণ্ড শীতে শত শত হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপবিহীন অবস্থায় পড়েছে।
মস্কো বলেছে, তাদের তেলবাহী জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে হামলা বাড়ানো হবে। অন্যদিকে ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা অধিকৃত ক্রিমিয়ায় দুটি রুশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে এবং কাস্পিয়ান সাগরে একটি রুশ তেল রিগ ও একটি টহল জাহাজে আঘাত হেনেছে।
রাশিয়া এই যুদ্ধকে ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঠেকাতে এবং ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিশেষ সামরিক অভিযান বলে দাবি করছে। তবে কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা বলছে, এটি ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী আগ্রাসন, যা ব্যাপক ধ্বংস ও সহিংসতার জন্ম দিয়েছে।
















