ঢাকার রাজপথে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঢেউ নতুন করে আলোচনায় এনেছে তরুণ ছাত্রনেতা ও উদীয়মান রাজনীতিক শরিফ ওসমান হাদির নাম। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর যিনি অল্প সময়েই পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছিলেন, তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল প্রবল ভারতবিরোধী বক্তব্য ও দেশের ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন—এমনটাই উঠে এসেছে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে।
হাদির হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকায় যে বিক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে ভারতবিরোধী স্লোগান আরও জোরালো হয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী দাবি করছেন, হামলাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে যে ভঙ্গুর শান্তি বিরাজ করছিল, তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় হাদি ছিলেন প্রায় অচেনা নাম। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর তার পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মঞ্চে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন এবং ঢাকার একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেন।
তার প্রথম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক দীর্ঘ পদযাত্রা। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ওপর ভারতের বাঁধ ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়ে তিনি দাবি করেন, হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণেই বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। সেই আন্দোলনে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ‘ইন্তিফাদা’ বা গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেন, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
হাদির প্রধান শক্তি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। চলতি বছরের মে মাসে খোলা তার ফেসবুক পেজ থেকেই তিনি ‘জুলাইয়ের ঐক্য ধ্বংসের ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যের’ বিরুদ্ধে ঢাকায় সমাবেশের ডাক দেন। ইনকিলাব মঞ্চের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোও একই সময়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
যখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাহিদ ইসলাম ও তার সহকর্মীরা নাগরিক পার্টি গঠনের পথে এগোচ্ছিলেন এবং প্রকাশ্যে চরমপন্থীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছিলেন, তখন হাদি ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি দেওবন্দি মাদ্রাসা ও কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান, যৌথ সমাবেশে অংশ নেন এবং অতীতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য তুলে ধরেন। এমনকি শেখ হাসিনার পতনের পর সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায়ও তিনি বক্তব্য দেন, যা আয়োজন করেছিল খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা এক যুব সংগঠন।
তার বক্তব্যে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও রেহাই পায়নি। শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানানো শিল্পীদের তিনি ‘সংস্কৃতি ধ্বংসকারী’ আখ্যা দেন। পাশাপাশি তিনি ইসকনকে নিয়ে যাচাইহীন অভিযোগ তুলে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী ও ভারতের এজেন্ট বলে আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।
ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রমে নিয়মিতভাবেই ভারতবিরোধী আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে। কখনও ভারতের সংখ্যালঘু পরিস্থিতির প্রতিবাদ, কখনও গাজার পক্ষে সমাবেশ, আবার কখনও কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভার আয়োজন—সবখানেই রাজনৈতিক বার্তা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এমন এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মানচিত্র নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, যেখানে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছিল।
হাদির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ইসলামি সংগঠনের আয়োজিত অনলাইন আলোচনায় তিনি বক্তব্য দেন, যেটি মানবাধিকার সংগঠনের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভারতবিরোধী প্রচার ও চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়ানোর অভিযোগে পরিচিত।
চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশের সবচেয়ে বড় দেওবন্দি মাদ্রাসায় দেওয়া এক বক্তব্যে হাদি দাবি করেন, গত বছরের ছাত্র আন্দোলনে ওই মাদ্রাসার ‘যোদ্ধারা’ নীরবে রাজপথে নেমেছিল। তার এই বক্তব্যও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
হাদির উত্থান, তার বক্তব্য এবং শেষ পর্যন্ত সহিংস মৃত্যু—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে। সামনে নির্বাচন, পেছনে ক্ষতবিক্ষত রাজপথ, আর মাঝখানে প্রশ্ন—এই উত্তাল সময়ে দেশ কোন পথে এগোবে।















