গাজা শহর—টানা বৃষ্টির শব্দে ভেঙে পড়েছিল আকাশ। আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে ওসামা আল-হুসারির বাড়ির ছাদে সেই রাতের ঝড় যেন থামতেই চাইছিল না। ৫৭ বছর বয়সী ওসামার এই ছোট্ট বাড়িতে তখন শুধু তার স্ত্রী রাওয়িয়া আর ১০ সন্তানই নয়, আশ্রয় নিয়েছিল আত্মীয়স্বজনসহ মোট ২৫ জন মানুষ।
দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি হামলার মধ্যেও কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটি। তবে দেয়াল ফেটে গিয়েছিল, ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছিল। মঙ্গলবার সকালে বৃষ্টি বাড়লে ওসামা ছাদে উঠে ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা মেরামতের চেষ্টা করেন। পাশে ছিলেন তার প্রতিবেশী ও বন্ধু, নির্মাণকর্মী মোহাম্মদ আল-হেলু।
হঠাৎই ঘটে যায় সেই মুহূর্ত—ছাদ ধসে পড়ে। ধুলা আর পাথরের ভয়ংকর ঝাঁপটা। মোহাম্মদ আল-হেলু চাপা পড়ে যান ধ্বংসস্তূপের নিচে। দুই ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা তার নিথর দেহ উদ্ধার করেন। এই ঘটনায় ছয়জন আহত হন, যাদের মধ্যে দুজন শিশু।
চোখের পানি মুছতে মুছতে ওসামা বলেন, অলৌকিকভাবে আমরা বেঁচে গেছি, কিন্তু এক মুহূর্তেই একজন প্রিয় মানুষকে হারালাম।
এই বাড়িটাই ছিল তাদের শেষ ভরসা। গাজায় যেখানে অধিকাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে একটি কংক্রিটের ছাদ মানেই ছিল নিরাপত্তা। যুদ্ধবিরতির পর বিভিন্ন জায়গা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পরিবারের সদস্যরা এখানে জড়ো হয়েছিলেন।
ওসামা জানান, এলাকায় শক্তিশালী অস্ত্র আর বিস্ফোরক রোবট ব্যবহারের ফলে চারপাশের সব বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার বাড়িও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবু তাঁবুতে থাকার চেয়ে এই ভাঙাচোরা দেয়ালের মধ্যেই থাকতে চেয়েছিলেন তারা। শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে মানুষ যে ঠান্ডায় মারা যাচ্ছে, সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভয়।
কিন্তু সেই কংক্রিটের ছাদই একদিন ভেঙে পড়বে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
ওসামার স্ত্রী রাওয়িয়া আল-হুসারি জানান, ছাদ ধসের মুহূর্তে তিনি সন্তানদের নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যান। পরে জানতে পারেন, তার ছেলে মোহাম্মদ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে। চিৎকার করতে করতে তিনি ছুটে যান, পাথর সরিয়ে ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন। পাশে চাপা পড়ে থাকা আত্মীয়টি আর সাড়া দেননি।
রাওয়িয়া বলেন, আমরা জানি না কীভাবে মরব—বোমায়, না কি ভেঙে পড়া বাড়ির নিচে। ধ্বংসস্তূপের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, যেন এক বা দুইটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে।
শীত শুরু হওয়ার পর গাজায় এ ধরনের ধসে পড়া বাড়ির সংখ্যা বেড়ে ১৭-এ দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শন ও মানুষকে সরিয়ে নিতে জরুরি কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে।
তবু আল-হুসারি পরিবার এখন খোলা রাস্তায়। সেই রাতেই ১২ জন শিশু ও নারী রাস্তায় ঘুমিয়েছেন, কোনো তাঁবু বা ত্রিপল ছাড়াই। ক্ষোভে ফেটে পড়ে ওসামা বলেন, আমাদের সামনে দুটি পথ—ভেঙে পড়া দেয়ালের নিচে মৃত্যু, অথবা শীতের রাস্তায় জমে মারা যাওয়া।
তার কণ্ঠে জমে থাকে অসহায় আকুতি—“ইচ্ছে হয়, সেই বাড়ির ভেতরেই যদি আমরা সবাই মারা যেতাম, এই জীবনটা দেখতে হতো না।”
















